বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়তে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ—সব মিলিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ঋণ গ্রহণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এবং অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি সরকারের ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ধার নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পর পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং দামও বেড়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি বাংলাদেশ কিনেছিল প্রায় ১০ থেকে ১১ ডলারে, এখন স্পট মার্কেটে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া থেকে প্রায় ২৪.৫ ডলার এবং গানভর থেকে ২৮ ডলার দামে এলএনজি কার্গো কিনেছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সরকারের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে।
বাজেট ঘাটতি ও ঋণ নির্ভরতা
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে একই বছরে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ পুরনো ঋণের কিস্তি শোধ করতেও নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা,
২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা,
এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ শোধ করতে হবে।
এর সঙ্গে সুদ পরিশোধও যুক্ত হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার শুধু সুদ বাবদ প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক ব্যয়
নির্বাচনের সময় দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্যও সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি
কৃষক কার্ড
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মৎস্যচাষীদের সহায়তা
দরিদ্র এতিম শিশুদের জন্য তহবিল
সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বৃদ্ধি
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ
এরই মধ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে এবং কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেছে। এসব কর্মসূচির বিস্তৃতি বাড়লে আগামী বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।
নতুন পে-স্কেলের চাপ
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও সামনে বড় ব্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এটি বাস্তবায়ন করা হলে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হতে পারে।
বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ
বিগত সরকারের সময় নেওয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধও এখন সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণ। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও ব্যয় বৃদ্ধি হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে।
এ ছাড়া দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। বছরে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা কিস্তি দিতে হচ্ছে, যা ২০২৮ সালে বেড়ে প্রায় ৬৬০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
মেট্রোরেল লাইন–৬ প্রকল্পের জন্য জাপানের জাইকার কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকার ঋণও ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে।
চীনের ঋণে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল এবং পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণ পরিশোধও সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত
সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পে-স্কেল বাস্তবায়ন, অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এবং সুদ ব্যয়—সব মিলিয়ে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব আদায় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
তবে তিনি বলেন, ঋণ সব সময় নেতিবাচক নয়। যদি উৎপাদনশীল খাত ও অবকাঠামো উন্নয়নে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো না গেলে বাংলাদেশ ঋণনির্ভরতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটালাইজেশন এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
আইএমএফের সহায়তায় ঋণ পরিকল্পনা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তায় সরকার প্রথমবারের মতো একটি “বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনা” প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এতে বছরের কোন সময়ে কোন উৎস থেকে কত ঋণ নেওয়া হবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা থাকবে।
এ বিষয়ে আগামী মে মাসে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশ সফর করবে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কাঠামোগত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যয় কমানোর পরামর্শ
সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয় কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে ব্যয় কমিয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অন্তত ৩০ শতাংশ কমানো যেতে পারে।
তার মতে, সেখান থেকে সাশ্রয় হওয়া অর্থ জ্বালানি ব্যয় এবং সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে আগামী অর্থবছরে সরকারের ঋণ ৩ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করাই বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















