যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড ওয়েলের দাম দ্রুত বেড়ে প্রায় ১০৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআইও প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে অস্থিরতা
২০২৬ সালের ১৬ মার্চ আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা গেছে। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ। এই সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান কার্যত এই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদন ও সরবরাহেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের পাশাপাশি চীনকেও হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে
টোকিও সময় দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৩৭ ডলার। আগের তুলনায় এটি ১ দশমিক ২৩ ডলার বা প্রায় ১ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সূচক হিসেবে ব্রেন্টের এই মূল্যবৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ সময় সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা করছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সূচক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ০৬ ডলারে লেনদেন হয়েছে। এতে দাম বেড়েছে ০ দশমিক ৩৫ ডলার বা প্রায় ০ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
মুরবান তেলের দামে পতন
অন্যদিকে আবুধাবির মুরবান তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ দশমিক ৪ ডলারে নেমে এসেছে। এটি আগের তুলনায় ৩ দশমিক ৩২ ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ৮২ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকদের মতে, মুরবান তেল অনেক সময় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ হওয়ায় হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক মূল্যপতনের পেছনে আতঙ্ক কিছুটা কমে আসা, রিফাইনারিগুলোর মজুত কমানো বা সরবরাহ আংশিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কাজ করতে পারে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম কিছুটা কমেছে
এই অস্থির বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও সামান্য কমেছে। গ্যাসের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১১৪ ডলারে, যা আগের তুলনায় সামান্য কম।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে চাহিদা তুলনামূলক কম থাকার পূর্বাভাস এই পতনের একটি কারণ।
বাজারে ভিন্নধর্মী প্রবণতা
বর্তমান বাজারে স্পষ্টভাবে ভিন্নধর্মী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম বাড়ছে মূলত ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে। যুদ্ধের ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকি প্রিমিয়াম তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মুরবান তেলের দাম কমে যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, কিছু বিনিয়োগকারী মনে করছেন পরিস্থিতি হয়তো ধীরে ধীরে শান্ত হতে পারে অথবা বিকল্প পরিবহন পথ ব্যবহার করে সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
তবে সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের শুরুর তুলনায় এখনো তেলের দাম অনেক বেশি। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে এবং শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে হামলা ও সরবরাহ সংকট
ইরানের হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে মাইন পেতে রাখার ঘটনায় বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাবেই দীর্ঘ সময় পর আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে আন্তর্জাতিক তেলের দাম।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দামের ওপর কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতিও বাজারে ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েছে।
মুরবান বাজারে প্রতিযোগিতা
সংকটের সময়ে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সরবরাহ করা যায় এমন তেলের চাহিদা বেড়ে যায়। সে কারণেই মুরবান তেলের দাম একসময় ১১৪ ডলারের ওপরে উঠেছিল।
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারা এবং সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার ইঙ্গিত বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আঞ্চলিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
আইইএর জরুরি তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বাজার স্থিতিশীল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটি সংস্থাটির ইতিহাসে অন্যতম বড় পদক্ষেপ।

তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দাম আরও বাড়তে পারে, যদিও সংঘাত কমে গেলে বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।
বিশ্ববাজারে বড় মূল্যবৃদ্ধি
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পদক্ষেপ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান
হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন দেশকে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশকে ট্যাংকার পাহারা দিতে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান।
তবে এসব দেশ এখন পর্যন্ত সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















