২০২৬ সালের শুরুতে চীনের অর্থনীতি তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে প্রবেশ করেছে। কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি, খুচরা বিক্রয় এবং বিনিয়োগে পুনরুদ্ধারের ফলে বছরের প্রথম দুই মাসে অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করায় ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি খাতে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করেছে। তবু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শিল্প উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি সময়ে শিল্প উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৩ শতাংশ বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। ফলে গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর এটিই শিল্প উৎপাদনের দ্রুততম বৃদ্ধি।
গুওতাই জুনান ইন্টারন্যাশনালের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাও ঝৌ বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে ঝুঁকি বাড়লেও সর্বশেষ তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে চীন প্রত্যাশার চেয়ে শক্ত ভিত্তিতে নতুন বছর শুরু করেছে।
খুচরা বিক্রয় ও ভোগব্যয় বৃদ্ধি
ভোক্তা ব্যয়ের অন্যতম সূচক খুচরা বিক্রয় জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে ২.৮ শতাংশ বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে এটি ছিল মাত্র ০.৯ শতাংশ। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল ২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘ লুনার নববর্ষের ছুটির কারণে এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ওই উৎসবের সময় পর্যটন ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে।
তবে প্রতিটি ভ্রমণে গড় ব্যয় ০.২ শতাংশ কমে গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভোক্তারা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে গত সপ্তাহে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রি বছরের প্রথম দুই মাসে ২৬ শতাংশ কমেছে।
চীন সাধারণত লুনার নববর্ষের কারণে অর্থনৈতিক তথ্য জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে প্রকাশ করে, যাতে উৎসবজনিত ওঠানামার প্রভাব কমে।
বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন
সোমবারের তথ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য আরেকটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সম্পত্তি খাতের মন্দার চাপের মধ্যেও বিনিয়োগে অপ্রত্যাশিত উত্থান দেখা গেছে।
স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগ, যার মধ্যে অবকাঠামো ও সম্পত্তি খাত অন্তর্ভুক্ত, বছরের প্রথম দুই মাসে ১.৮ শতাংশ বেড়েছে। অথচ বিশ্লেষকরা ২.১ শতাংশ হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে এই খাতে ৩.৮ শতাংশ পতন ঘটেছিল, যা প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথম বার্ষিক পতন।
বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ১১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করায় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে ব্যাংক থেকে অর্থ সরবরাহ সহজ হয়েছে।
তবু বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদেশি চাহিদা শক্তিশালী হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় দুর্বল থাকায় দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এএনজেড ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ঝাওপেং শিং বলেন, মার্চ মাসেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নিম্নমুখী চাপ থাকতে পারে। তবে বর্তমান তথ্য অনুযায়ী নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা যাচ্ছে না।
বেকারত্ব বাড়ছে, চাকরি পাওয়া কঠিন
অর্থনীতির ইতিবাচক কিছু ইঙ্গিত থাকলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। জরিপভিত্তিক জাতীয় বেকারত্বের হার ডিসেম্বরের ৫.১ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে ৫.৩ শতাংশ হয়েছে।
একই সঙ্গে ঋণ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গৃহস্থালি ঋণ গ্রহণেও মন্দা অব্যাহত রয়েছে।
বেইজিংয়ে একটি চাকরি মেলায় অংশ নেওয়া শিক্ষা বিভাগের স্নাতক বাই নামের এক তরুণ বলেন, বর্তমানে চাকরির বাজার খুব কঠিন, কাজ খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
গত সপ্তাহে শেষ হওয়া জাতীয় সংসদ অধিবেশনে চীনের নীতিনির্ধারকেরা এ বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ। গত বছর লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ শতাংশ, যা মূলত ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্তের কারণে অর্জিত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকার ভোগব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত খুব সীমিত।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। ফলে মার্চের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে গুরুত্ব বেড়েছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর মুখপাত্র ফু লিংহুই জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তেলের দামের অস্থিরতা ও বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে চীনের পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ বাহ্যিক ধাক্কা কিছুটা সামাল দিতে পারে। তিনি বলেন, এই সংঘাতের কারণে দেশের ভেতরের দামে কী প্রভাব পড়বে তা আরও পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝি ওয়েই ঝাং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আগামী মাসগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। প্রয়োজন হলে সরকার রাজস্ব নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাজার এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের আসন্ন বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে। বাণিজ্য ভারসাম্য কমাতে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পণ্য কিনতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















