০৬:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি: এডিবি বছরের শুরুতেই তাপমাত্রার রেকর্ড, উদ্বেগ বাড়ছে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সংঘর্ষে ইসরায়েলি সেনা নিহত এআই দৌড়ে ডেটা চুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা, বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের মাঝে খাবারের লড়াই, বৈরুতে রান্নাঘরে মানুষের পাশে মানুষ রেড সি ঝুঁকিতে জাহাজ ঘুরছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন চাপ ট্রাম্প-স্টারমার দ্বন্দ্বে নতুন উত্তাপ, ইরান ইস্যুতে জোটে ফাটল গভীর ইরানকে সতর্ক বার্তা ট্রাম্পের, চুক্তির সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে ট্রাম্প-শি বৈঠকের নতুন তারিখ ঘোষণা, নিশ্চিত করল না বেইজিং পটুয়াখালীর বাউফলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষ

হরমুজ প্রণালি খুলতে ট্রাম্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কেন

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্রদেশগুলোর সহায়তা চেয়েছেন। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। তবে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা গেলেও ইরানের আরোপ করা অবরোধ দ্রুত তুলে দেওয়া সহজ হবে না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ইরান প্রণালির এক পাশ জুড়ে অবস্থান করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ধীরগতিতে চলা বিশাল তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকারগুলোর চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

কেন এখন প্রণালি বন্ধ করল ইরান

২০১১ সালেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের এক কমান্ডার বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা তাদের জন্য ‘এক গ্লাস পানি পান করার মতো সহজ’। এরপর বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনার সময়, তারা একই ধরনের হুমকি দিয়েছে।

২০১৬ ও ২০১৮ সালে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উত্তেজনার সময়, আবার গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরও এই হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য প্রণালি বন্ধ করা সবসময়ই ছিল চূড়ান্ত পদক্ষেপ। কারণ এতে তাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তনের পথে যেতে পারে এবং ইরানের নিজস্ব জ্বালানি খাতও পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা এই সংঘাতকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে বর্ণনা করছেন এবং কঠোরপন্থী রেভল্যুশনারি গার্ড এখন কৌশল নির্ধারণে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের জন্য কী ঝুঁকি

ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত সরু এই সমুদ্রপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। কুয়েত, ইরান, ইরাক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটিই একমাত্র সমুদ্রপথ।

প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম ইতোমধ্যে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে। জাতিসংঘের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আবারও বৈশ্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তৈরি হতে পারে, যেমনটি হয়েছিল ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর।

এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বব্যাপী সার সরবরাহেও বড় ধাক্কা দিতে পারে। বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩৩ শতাংশ সার—যার মধ্যে সালফার ও অ্যামোনিয়াও রয়েছে—এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে ১৯৭০–এর দশকের মধ্যপ্রাচ্যের তেল সংকটের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

প্রণালি নিরাপদ করা এত কঠিন কেন

হরমুজ প্রণালির নৌপথ অত্যন্ত সরু। অনেক জায়গায় শিপিং লেনের প্রস্থ মাত্র দুই নটিক্যাল মাইল। জাহাজগুলোকে ইরানের দ্বীপ ও পাহাড়ি উপকূলের কাছ দিয়ে ঘুরে যেতে হয়, যা ইরানি বাহিনীর জন্য আড়াল তৈরি করে।

ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও রেভল্যুশনারি গার্ডের হাতে এখনও বহু কৌশল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা, ক্ষুদ্র সাবমেরিন, সমুদ্র মাইন এমনকি বিস্ফোরকভর্তি জেট স্কি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্সের মতে, ইরান প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কমান্ডার টম শার্পের মতে, স্বল্প সময়ের জন্য দিনে তিন বা চারটি জাহাজকে সাত থেকে আটটি ডেস্ট্রয়ারের সহায়তায় নিরাপদে প্রণালি পার করানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযান মাসের পর মাস চালিয়ে যেতে হলে অনেক বেশি সামরিক সম্পদ প্রয়োজন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমনকি যদি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা ভাসমান মাইন ব্যবহারের ক্ষমতা ধ্বংসও করা হয়, তবুও আত্মঘাতী হামলার ঝুঁকি থেকে যাবে।

যদি যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তাহলে কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বহর গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। কারণ বিশ্বের অর্থনীতির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প কী চান, মিত্ররা কী করছে

ট্রাম্প জানিয়েছেন, অনেক দেশ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে বলে তিনি আশা করছেন এবং ইতোমধ্যে সাতটি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।

এর এক সপ্তাহ আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য বীমা ও আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, লন্ডন মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইয়েমেনের হুথিদের হামলা থেকে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল রক্ষায় চলমান নৌ মিশন শক্তিশালী করার বিষয়টি আলোচনা করতে পারেন। তবে সেই মিশন হরমুজ প্রণালিতে সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ যৌথ নিরাপত্তা মিশনের পরিকল্পনা করছে, তবে সেটি সংঘাত শেষ হওয়ার পরই বাস্তবায়ন হতে পারে।

জার্মানি এই ধরনের মিশন বাড়ানোর বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, লোহিত সাগরে বিদ্যমান মিশনও খুব কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও জানিয়েছে, তারা আপাতত প্রণালিতে জাহাজ পাহারা দিতে নৌবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না।

অঞ্চলের অন্য সমুদ্রপথে কী ঘটেছে

ইরানপন্থী ইয়েমেনি হুথি গোষ্ঠী গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে লোহিত সাগরের বড় অংশে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে রেখেছিল, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নৌবাহিনী সেখানে টহল দিচ্ছিল।

এর ফলে বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি এখনও আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে।

ডেনমার্কের শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক জানিয়েছিল, তারা ধীরে ধীরে সুয়েজ খাল রুটে ফিরতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বে সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যু দমন অভিযান তুলনামূলক সফল হলেও সেখানে যে শক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের তুলনায় অনেক কম শক্তিশালী ছিল।

প্রণালির বিকল্প কি আছে

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে তেল পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন তৈরির চেষ্টা করেছে।

তবে এসব পাইপলাইন এখনও পুরোপুরি কার্যকর নয়। ২০১৯ সালে হুথি যোদ্ধাদের হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের ক্ষতি হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে যে বিকল্প ব্যবস্থাও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি: এডিবি

হরমুজ প্রণালি খুলতে ট্রাম্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কেন

০৭:৫৫:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্রদেশগুলোর সহায়তা চেয়েছেন। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। তবে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা গেলেও ইরানের আরোপ করা অবরোধ দ্রুত তুলে দেওয়া সহজ হবে না বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ইরান প্রণালির এক পাশ জুড়ে অবস্থান করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ধীরগতিতে চলা বিশাল তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকারগুলোর চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

কেন এখন প্রণালি বন্ধ করল ইরান

২০১১ সালেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের এক কমান্ডার বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা তাদের জন্য ‘এক গ্লাস পানি পান করার মতো সহজ’। এরপর বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনার সময়, তারা একই ধরনের হুমকি দিয়েছে।

২০১৬ ও ২০১৮ সালে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উত্তেজনার সময়, আবার গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরও এই হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য প্রণালি বন্ধ করা সবসময়ই ছিল চূড়ান্ত পদক্ষেপ। কারণ এতে তাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তনের পথে যেতে পারে এবং ইরানের নিজস্ব জ্বালানি খাতও পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা এই সংঘাতকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে বর্ণনা করছেন এবং কঠোরপন্থী রেভল্যুশনারি গার্ড এখন কৌশল নির্ধারণে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের জন্য কী ঝুঁকি

ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত সরু এই সমুদ্রপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। কুয়েত, ইরান, ইরাক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটিই একমাত্র সমুদ্রপথ।

প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম ইতোমধ্যে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে। জাতিসংঘের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আবারও বৈশ্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তৈরি হতে পারে, যেমনটি হয়েছিল ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর।

এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বব্যাপী সার সরবরাহেও বড় ধাক্কা দিতে পারে। বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩৩ শতাংশ সার—যার মধ্যে সালফার ও অ্যামোনিয়াও রয়েছে—এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে ১৯৭০–এর দশকের মধ্যপ্রাচ্যের তেল সংকটের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

প্রণালি নিরাপদ করা এত কঠিন কেন

হরমুজ প্রণালির নৌপথ অত্যন্ত সরু। অনেক জায়গায় শিপিং লেনের প্রস্থ মাত্র দুই নটিক্যাল মাইল। জাহাজগুলোকে ইরানের দ্বীপ ও পাহাড়ি উপকূলের কাছ দিয়ে ঘুরে যেতে হয়, যা ইরানি বাহিনীর জন্য আড়াল তৈরি করে।

ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও রেভল্যুশনারি গার্ডের হাতে এখনও বহু কৌশল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা, ক্ষুদ্র সাবমেরিন, সমুদ্র মাইন এমনকি বিস্ফোরকভর্তি জেট স্কি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্সের মতে, ইরান প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কমান্ডার টম শার্পের মতে, স্বল্প সময়ের জন্য দিনে তিন বা চারটি জাহাজকে সাত থেকে আটটি ডেস্ট্রয়ারের সহায়তায় নিরাপদে প্রণালি পার করানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযান মাসের পর মাস চালিয়ে যেতে হলে অনেক বেশি সামরিক সম্পদ প্রয়োজন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমনকি যদি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা ভাসমান মাইন ব্যবহারের ক্ষমতা ধ্বংসও করা হয়, তবুও আত্মঘাতী হামলার ঝুঁকি থেকে যাবে।

যদি যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তাহলে কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বহর গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। কারণ বিশ্বের অর্থনীতির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প কী চান, মিত্ররা কী করছে

ট্রাম্প জানিয়েছেন, অনেক দেশ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে বলে তিনি আশা করছেন এবং ইতোমধ্যে সাতটি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।

এর এক সপ্তাহ আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশনকে শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য বীমা ও আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, লন্ডন মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইয়েমেনের হুথিদের হামলা থেকে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল রক্ষায় চলমান নৌ মিশন শক্তিশালী করার বিষয়টি আলোচনা করতে পারেন। তবে সেই মিশন হরমুজ প্রণালিতে সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ যৌথ নিরাপত্তা মিশনের পরিকল্পনা করছে, তবে সেটি সংঘাত শেষ হওয়ার পরই বাস্তবায়ন হতে পারে।

জার্মানি এই ধরনের মিশন বাড়ানোর বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, লোহিত সাগরে বিদ্যমান মিশনও খুব কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও জানিয়েছে, তারা আপাতত প্রণালিতে জাহাজ পাহারা দিতে নৌবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না।

অঞ্চলের অন্য সমুদ্রপথে কী ঘটেছে

ইরানপন্থী ইয়েমেনি হুথি গোষ্ঠী গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে লোহিত সাগরের বড় অংশে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে রেখেছিল, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নৌবাহিনী সেখানে টহল দিচ্ছিল।

এর ফলে বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি এখনও আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে।

ডেনমার্কের শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক জানিয়েছিল, তারা ধীরে ধীরে সুয়েজ খাল রুটে ফিরতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বে সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যু দমন অভিযান তুলনামূলক সফল হলেও সেখানে যে শক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের তুলনায় অনেক কম শক্তিশালী ছিল।

প্রণালির বিকল্প কি আছে

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে তেল পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন তৈরির চেষ্টা করেছে।

তবে এসব পাইপলাইন এখনও পুরোপুরি কার্যকর নয়। ২০১৯ সালে হুথি যোদ্ধাদের হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের ক্ষতি হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে যে বিকল্প ব্যবস্থাও ঝুঁকিমুক্ত নয়।