বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদ মোস্তাকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা পরিবারের প্রভাবের অধীনে পরিচালিত হবে না। অতীতের বিতর্কিত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাংকটিকে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদের চার সদস্য এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সুশাসনের অভাবের কথাও স্বীকার
বৈঠকে গভর্নর বলেন, একসময় ইসলামী ব্যাংক ছিল দেশের অন্যতম শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরে সুশাসনের ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি নানা সমস্যায় পড়ে।
তিনি জানান, ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা ও কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এতে করে ব্যাংকটির প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বরখাস্ত কর্মকর্তাদের আন্দোলন
ইসলামী ব্যাংকের বরখাস্ত হওয়া হাজারো কর্মকর্তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সোমবারের বৈঠকে মানবসম্পদ সংক্রান্ত এই বিষয়টি আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে।
এস আলম গ্রুপের প্রভাবের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ আটটি ব্যাংকের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছিল। এর মধ্যে চারটি ব্যাংক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ব্যাংক থেকে প্রায় এক লাখ নব্বই হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য বলছে, প্রতারণা ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে।
শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এস আলম গ্রুপের প্রধান সাইফুল আলম মাসুদ নিজের নাম বা বিভিন্ন মধ্যস্থ ব্যক্তির মাধ্যমে এসব অর্থ নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যবসায়িক অগ্রগতি
সব বিতর্কের মধ্যেও গত বছরে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দুই হাজার পঁচিশ সালের শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত দাঁড়ায় এক লাখ তিরাশি হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এতে যোগ হয়েছে প্রায় বাইশ হাজার কোটি টাকা।
এজেন্ট ব্যাংকিং খাতেও আমানত বেড়ে হয়েছে বাইশ হাজার কোটি টাকা। প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে গত বছরে ব্যাংকটি সংগ্রহ করেছে ছিয়াত্তর হাজার কোটি টাকা।
একই সময়ে আমদানি বাণিজ্য দাঁড়ায় ষাট হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বাণিজ্য হয় বত্রিশ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির গ্রাহকসংখ্যা এখন তিন কোটি, যার মধ্যে গত এক বছরেই যুক্ত হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ লাখ নতুন গ্রাহক।
খেলাপি ঋণের চাপ
গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় আটান্ন শতাংশ। তবে শেষ প্রান্তিকে ব্যাংকটি চৌদ্দ হাজার একশ ঊনষাট কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় বিরানব্বই হাজার একশ পনেরো কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় সাতচল্লিশ শতাংশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















