মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে বড় ধাক্কা দিয়েছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, শেয়ারবাজারে পতন, ভ্রমণ খরচ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা—সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
ব্রেন্ট তেলের দাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই পথে অস্থিরতা দেখা দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবের মুখে পড়েছে।

বাড়ছে জ্বালানি খরচ, কমছে উৎপাদন
জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত ৮৫টি দেশে পেট্রোলের দাম বেড়েছে।
কিছু দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। কোথাও চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে, কোথাও আবার সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে। কিছু দেশে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীর করে দেয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও বড় পতন দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে বড় বড় শেয়ারবাজারে সূচক কমেছে কয়েক শতাংশ পর্যন্ত।
বিশেষ করে এশিয়ার বাজারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ এসব অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের কিছু কোম্পানি লাভবান হওয়ায় সেখানে প্রভাব কিছুটা কম।

মূল্যস্ফীতি ও মন্দার শঙ্কা
বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিহাসে দেখা গেছে, তেলের দাম হঠাৎ বাড়লে অনেক সময়ই তা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার দিকে নিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল অনেক দেশ ঋণ সংকটের ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
ভ্রমণ ও বিমান খাতে প্রভাব
যুদ্ধের কারণে শুধু জ্বালানি বাজারই নয়, বিমান চলাচলেও বড় প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে ঝুঁকি বাড়ায় অনেক বিমান সংস্থা রুট পরিবর্তন করেছে।
এতে উড়োজাহাজের জ্বালানি খরচ বেড়েছে এবং টিকিটের দামও অনেক রুটে বেড়ে গেছে। আগে যেখানে জেট জ্বালানির দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল, এখন তা বেড়ে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
অনেক ফ্লাইটকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে, ফলে ভ্রমণ সময় ও খরচ দুইই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে পর্যটন খাতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















