মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক কৌশল নিয়েছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নিজেদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরান-সম্পৃক্ত ট্যাঙ্কার নেটওয়ার্ককেই এবার ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন, যাতে রাশিয়ার তেল বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছায় এবং দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের দাম প্রায় চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে তেল পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়লেও বাজারে স্থিতি ফিরেনি।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এমন জাহাজগুলোকে তেল পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ইরানের সামরিক বা সরকারি সংযোগ রয়েছে। এসব জাহাজ দীর্ঘদিন ধরে গোপনে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশের জন্য তেল পরিবহন করে আসছিল।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে একই সঙ্গে একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, এখন তারাই বৈশ্বিক তেল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাচ্ছে।
এই নীতির আওতায় অন্তত কয়েকশ জাহাজকে সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যেগুলো ইতিমধ্যে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেল বহন করছে। প্রায় এক মাসের জন্য দেওয়া এই অনুমতিতে এসব তেল যেকোনো দামে বিক্রি করা যাবে, ফলে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো বড় ধরনের লাভের সুযোগ পাচ্ছে।
‘ভূত জাহাজ’ নেটওয়ার্কের উত্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরান ও রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের সুবিধা তৈরি করতে পারে। বহুদিন ধরে ছায়া নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত এই জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক নজর এড়িয়ে তেল পরিবহন করত। এখন তাদের কার্যক্রম আংশিকভাবে বৈধতা পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা দুর্বল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, দালাল ও বিমা সংস্থাগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করবে। এমনকি যুদ্ধের আগে কম দামে কেনা তেল এখন উচ্চ দামে পুনরায় বিক্রি করে দ্বিগুণ লাভ করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের গভীরতা
বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতিদিনের তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন সংকট হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। তেলের দাম একশ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই সাময়িক নীতি পরিবর্তন মূলত বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর চেষ্টা। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে বদলাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















