মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববাজারে। একের পর এক হামলায় তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তেহরান ও তেল আবিবে হামলার পাল্টাপাল্টি চিত্র
শুক্রবার ইসরায়েল তেহরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে তাদের সামরিক বাহিনী। একই সময়ে ইরানও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলে আঘাত হানে। এতে তেল আবিবে সাইরেন বেজে ওঠে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
এর আগের দিন ইরানের হামলায় ইসরায়েলের একটি তেল শোধনাগার লক্ষ্যবস্তু হয়। যদিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবু বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত, সংকট আরও গভীর
সাম্প্রতিক হামলাগুলো মূলত জ্বালানি খাতকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে। কাতারের প্রধান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ব তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। এই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কিছু জ্বালানি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে। কুয়েতে একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরেও হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা
এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে। একদিকে হামলার কারণে সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশ জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে উদ্যোগ নেওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরছে। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ যে জলপথ দিয়ে হয়, সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী এখন বড় ঝুঁকির মুখে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা ও রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে হামলা না চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, ভবিষ্যতে এমন হামলা পুনরাবৃত্তি না হওয়ার বিষয়ে আশ্বাস পেয়েছেন।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলার সিদ্ধান্ত তারা একাই নিয়েছে। এতে দুই মিত্র দেশের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী করছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করছে।
যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে, বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি

ইরান বলছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তারা সতর্ক করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জ্বালানি স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হবে।
একই সঙ্গে ইরান দাবি করেছে, যুদ্ধ চলাকালেও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে এবং সক্ষমতা নিয়ে কোনো সংকট নেই।
সংকটের সমাধান এখনও অনিশ্চিত
সংঘাত বন্ধের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত না থাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন। ইউরোপের কয়েকটি দেশ জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তার আশ্বাস দিলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















