বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যেখানে আগে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ চলাচল করত, এখন সেখানে দিনে গড়ে মাত্র কয়েকটি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
জাহাজ চলাচলে ৯৫ শতাংশ পতন
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কমতে থাকে। আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৮টি জাহাজ এই পথে যাতায়াত করলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৫ থেকে ৬টিতে। মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট প্রায় ৯৯টি জাহাজ এই সংকীর্ণ প্রণালী পার হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কম।
এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। ফলে এখানকার পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

ইরান-সংযুক্ত জাহাজের আধিপত্য
সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই পথ দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করছে তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে ইরানের সরাসরি বা পরোক্ষ সংযোগ রয়েছে। ইরানের পতাকাবাহী জাহাজ ছাড়াও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু জাহাজও এই পথে চলাচল করছে।
এছাড়া চীন-সংযুক্ত কোম্পানির মালিকানাধীন কিছু জাহাজ এবং ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রারত কয়েকটি জাহাজও এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করছে। এমনকি কিছু ইউরোপীয় মালিকানাধীন জাহাজও ইরানের বন্দরে নোঙর করেছে, যা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।
বদলে গেছে জাহাজের রুট
নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে অনেক জাহাজ এখন প্রচলিত আন্তর্জাতিক পথ ছেড়ে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করছে। এতে তারা কার্যত ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করছে এবং তেহরানের নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের এক ধরনের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ, যেখানে সরাসরি পথ বন্ধ না করেও ভয় ও অনিশ্চয়তার মাধ্যমে জাহাজগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন পথে নিয়ে আসা হচ্ছে।
হামলা ও চার ধরনের বড় হুমকি
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগতির নৌযান এবং সম্ভাব্য মাইন—এই চার ধরনের হুমকি এখন জাহাজ চলাচলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি থাই পতাকাবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় কয়েকজন নাবিক নিখোঁজ হয়েছে এবং অন্য এক হামলায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে চলাচল করছে।
ট্র্যাকিং বন্ধ করে গোপন চলাচল

ঝুঁকি এড়াতে অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকারী প্রযুক্তি বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে তারা মানচিত্র থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং পরে অন্য স্থানে আবার দেখা যাচ্ছে।
যদিও এটি জাহাজগুলোর অবস্থান গোপন রাখতে সহায়ক, তবে একই সঙ্গে এটি নিরাপত্তা ও নজরদারির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাড়ছে চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ এই পথটি কেবল একটি জলপথ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















