ঢাকা তখন আজকের মতো ব্যস্ত, উঁচু অট্টালিকার শহর নয়—বরং শান্ত, ছিমছাম, অনেকটা আপন-আপন গন্ধে ভরা এক শহর। ষাটের দশকের ঈদ মানেই ছিল এক ধরনের সরল আনন্দ, যেখানে আড়ম্বরের চেয়ে আন্তরিকতার রং ছিল বেশি গাঢ়।

ঈদের চাঁদ দেখার মধ্যেই শুরু হতো উচ্ছ্বাস। রেডিওতে খবর শোনার অপেক্ষা, কিংবা পাড়ার কারও ছাদ থেকে “চাঁদ দেখা গেছে!”—এই ঘোষণা যেন মুহূর্তেই সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিত উৎসবের স্রোত। শিশুরা ছুটে বেড়াত, বড়রা হাসিমুখে একে অন্যকে জানাত শুভেচ্ছা।
চাঁদ রাত ছিল এক অন্যরকম জাদুর সময়। নিউ মার্কেট বা চকবাজারে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা, টেইলরের দোকানে ভিড়—“কাল সকালেই চাই”—এই অনুরোধে ব্যস্ত সময় কাটাত মানুষ। নতুন কাপড়ের গন্ধ, আতরের হালকা সুবাস, আর মায়ের হাতে বানানো সেমাইয়ের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক মায়াবী আবহ।
ঈদের সকাল শুরু হতো খুব ভোরে। বাবা বা বড় ভাইয়ের সঙ্গে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাওয়া ছিল এক গর্বের বিষয়। রাস্তাঘাট তখন প্রায় ফাঁকা, কিন্তু মানুষের মুখে ছিল আলাদা এক উজ্জ্বলতা। নামাজ শেষে কোলাকুলি—“ঈদ মোবারক”—এই দুটি শব্দে যেন জমে থাকত পুরো বছরের ভালোবাসা।

বাড়িতে ফিরে অপেক্ষা করত সেমাই, পোলাও, কোরমা। রান্নার স্বাদে ছিল ঘরের উষ্ণতা। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি যাওয়া, বিশেষ করে নানা-নানির বাড়ি, ছিল ঈদের সবচেয়ে আনন্দের অংশ। ‘সালামি’ পাওয়ার উত্তেজনা শিশুদের চোখে মুখে ঝলমল করত।
তখনকার ঈদে প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিল না, ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়। তবু সম্পর্কগুলো ছিল গভীর, সময়গুলো ছিল ধীর আর অর্থবহ। একটি সাদামাটা নতুন জামা, কয়েকজন প্রিয় মানুষ আর একসাথে কাটানো সময়—এই ছোট ছোট জিনিসই ঈদকে করে তুলত অসাধারণ।
আজকের ঢাকায় ঈদ এসেছে আধুনিকতার মোড়কে, কিন্তু ষাটের দশকের সেই ঈদ ছিল হৃদয়ের খুব কাছে—নির্মল, আন্তরিক, আর চিরস্মরণীয়।
জাহিদ রহমান 



















