ঈদুল ফিতর মানেই আনন্দ, মিলন আর নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের জেলেদের জন্য এই ঈদ এক ভিন্ন আবেগের গল্প—যেখানে আছে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, আর শেষে ফিরে পাওয়ার অপার সুখ।
রমজান মাস জুড়ে অনেক জেলে থাকেন গভীর সমুদ্রে। সেখানে নেই শহরের মতো ব্যস্ততা, নেই ঈদের বাজারের কোলাহল। দিনের পর দিন তারা কাটান নোনাজলে, ঝড়-তুফানের সঙ্গে লড়ে, মাছ ধরার আশায়। রোজা রাখাও তাদের জন্য সহজ নয়। প্রচণ্ড রোদ, ক্লান্তিকর পরিশ্রম আর সীমিত খাবারের মধ্যে থেকেও তারা রোজা রাখার চেষ্টা করেন। সূর্যাস্তের সময় নৌকাতেই ছোট্ট ইফতার—কখনো খেজুর, কখনো ভাত আর শুকনো মাছ—এই সামান্যতেই তারা খুঁজে নেন তৃপ্তি।

ঈদ যত ঘনিয়ে আসে, তত বাড়ে ঘরে ফেরার আকুলতা। পরিবার, সন্তান, প্রিয়জন—সবাই অপেক্ষায় থাকে। অনেক সময় আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে সেই ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবুও জেলেদের চোখে থাকে একটাই স্বপ্ন—ঈদের নামাজটা যেন গ্রামের মসজিদেই পড়তে পারেন।
যারা ঈদের আগে ফিরতে পারেন, তাদের গ্রামে তখন উৎসবের আমেজ। নতুন লুঙ্গি, পাঞ্জাবি বা শাড়ি—সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, তাই দিয়েই আনন্দ সাজানো হয়। ঈদের সকালে গ্রামের মসজিদে নামাজ পড়ার পর শুরু হয় কোলাকুলি। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সঙ্গে মিলনের সেই মুহূর্ত হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় উপহার।
আর যারা ফিরতে পারেন না? তাদের ঈদ কাটে নৌকাতেই। সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়েই তারা ঈদের নামাজ আদায় করেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। রান্না হয় একটু ভালো কিছু—হয়তো ধরা পড়া তাজা মাছ দিয়ে বিশেষ কোনো পদ। দূরে কোথাও দিগন্তের ওপারে পরিবার—তবুও সহকর্মীরাই হয়ে ওঠে তাদের অস্থায়ী পরিবার।

জেলেদের ঈদে বিলাসিতা কম, কিন্তু আবেগ গভীর। তাদের কাছে ঈদ মানে শুধু নতুন কাপড় নয়, বরং জীবিত ফিরে আসা, পরিবারের মুখ দেখা, আর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সমুদ্রের অনিশ্চয়তার মাঝেও তারা খুঁজে নেন আশার আলো।
বঙ্গোপসাগরের ঢেউ যেমন অনন্ত, তেমনি এই জেলেদের জীবনসংগ্রামও চলমান। কিন্তু ঈদ এলে সেই সংগ্রামের মাঝেই তারা খুঁজে পান শান্তি, ভালোবাসা আর নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি।
দ্বীপ্তি বড়ুয়া 



















