বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালীতে সামান্য বিঘ্নও পাকিস্তানের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই সতর্কবার্তা। বৈশ্বিক তেল সরবরাহে ধাক্কা লাগলে দ্রুত বাড়তে পারে জ্বালানির দাম, ত্বরান্বিত হতে পারে মূল্যস্ফীতি এবং চাপ তৈরি হতে পারে দেশের বৈদেশিক খাতে।
জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি, বাড়ছে ঝুঁকি
গবেষণায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মোট আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশই জ্বালানি পণ্য। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়, যা এই পথটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এই প্রবাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দ্রুত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মূল্যস্ফীতির বহুমাত্রিক চাপ
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু অপরিশোধিত তেলের দামই নয়, বরং পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ, বিনিময় হার ও কর কাঠামোর পরিবর্তন মিলিয়ে জ্বালানির চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়। সংকটকালে এসব খরচ একসঙ্গে বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও তীব্র হয়।
বিশ্লেষণে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। সামান্য ধাক্কায় ছয় মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। মাঝারি চাপের পরিস্থিতিতে তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং গুরুতর ধাক্কায় ১২ শতাংশেরও বেশি হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ডিজেলভিত্তিক পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এই প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বৈদেশিক খাতে বড় ধাক্কা
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, হরমুজে কোনো বিঘ্ন ঘটলে পাকিস্তানের বৈদেশিক ভারসাম্যও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। মাসিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে পারে এবং চলতি হিসাব দ্রুত উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে পরিণত হতে পারে। এর ফলে মুদ্রার মান কমে গিয়ে আরও বেশি আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা এক ধরনের চক্রাকার সংকট তৈরি করে।
ডিজেলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি
গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজেল পাকিস্তানের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। পরিবহন, কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এর গভীর প্রভাব থাকায় ডিজেলের দাম বাড়লে খাদ্যদ্রব্যের দামও দ্রুত বেড়ে যায়।
নীতিগত পদক্ষেপের তাগিদ
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণায় দ্রুত ও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জ্বালানির দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক কাঠামো তৈরি, ডিজেলের বাজার নজরদারি জোরদার, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
গবেষণার মূল বার্তা স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালীতে কোনো অস্থিরতা কেবল আন্তর্জাতিক ঘটনা নয়, বরং তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে ফিরে আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















