মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে আসার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় ইরান পাকিস্তানের পতাকাবাহী একাধিক তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “উপহার” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এটিকে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তেহরানের আন্তরিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে পাকিস্তান নিজেকে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির—যাকে ট্রাম্প “প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে উল্লেখ করেছেন—এই ভূমিকার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার সুযোগ পাচ্ছেন।
পাকিস্তানের জন্য এই উদ্যোগ কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং বাস্তব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। ইরানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এই দেশটির জন্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা সরাসরি অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাই সংঘাত থামাতে সহায়তা করা ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ভূমিকার সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, পাকিস্তানের ভারসাম্য রক্ষা করা তত কঠিন হয়ে উঠবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ায়, তাহলে পাকিস্তান ইরানের চোখে সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত হতে পারে এবং এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কেও আস্থা কমে যেতে পারে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়েছে। আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পাকিস্তান ১৫ দফা মার্কিন শান্তি পরিকল্পনা ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার কথা বলেছেন, যাতে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।
যদিও ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও পাকিস্তান আলোচনার আয়োজক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, তার সরকার এই আলোচনাকে স্বাগত জানায় এবং সম্পূর্ণ সমর্থন করে।
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গর্ব করে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের চীন সফর এবং আফগান তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও ইরানের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছিল, এরপর দুই দেশই সহযোগিতা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে পাচার ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, এক পক্ষের ওপর হামলা অন্য পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। ফলে সংঘাত বাড়লে পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে—যা ইসলামাবাদ এড়াতে চায়।
এছাড়া, সৌদি ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পাকিস্তানের ভেতরে অনেকে মনে করছেন, এই চুক্তি প্রত্যাশিত নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারেনি।
পাকিস্তানের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ জনমত। দেশটিতে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব রয়েছে, পাশাপাশি প্রায় চার কোটি শিয়া মুসলমানের একটি বড় জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল। সংঘাতের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ নিহত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান মূলত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে যাতে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়ানো যায়। কারণ একই সময়ে দেশটি পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত এবং তালেবানের বিরুদ্ধে নতুন করে লড়াই শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।
এছাড়া জ্বালানি সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক চাপও রয়েছে। পাকিস্তানের প্রায় সব জ্বালানি আমদানি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে, যা এই সংঘাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার ফলে পাকিস্তানের শহুরে অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সরকারের প্রতি সমর্থন কিছুটা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের দুর্বল অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশলও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে—একদিকে কূটনৈতিক সুযোগ, অন্যদিকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি। এই ভারসাম্য কতদিন ধরে রাখা সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
Sarakhon Report 



















