বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উপকূলজুড়ে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে।
অনেক সময় সুন্দরবনকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করেও এই বন দুর্বল জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকি থেকে সুরক্ষা দেয়। শুধু সুরক্ষা নয়, সুন্দরবন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ধারণ করে এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা নির্বাহের ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই মানুষ ও প্রকৃতির জন্য এই বন সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি আমি আমার নাতি তানজিফ ও তাওফিক এবং তাদের বাবা-মা শাহরিন ও আসিফকে নিয়ে সুন্দরবন ঘুরে এসেছি। ২৬ তারিখে আমরা ফিরে আসি। আমার মেয়েকে বোঝাতে বেশ সময় লেগেছে যে কক্সবাজারের চেয়ে সুন্দরবন ভ্রমণ অনেক বেশি অর্থবহ—বিশেষ করে যারা আগে এখানে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই এই উপলব্ধি।
নতুন প্রজন্ম সুন্দরবনকে কীভাবে দেখে, তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া জাহান শেফার লেখা খুঁজে পাই। ২০২৪ সালের ৩ জুন তিনি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার সম্পাদককে লিখেছিলেন:
সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো, যে প্রতিকূলতা সহ্য করেও আমাদের রক্ষা করে। এটি উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রকৃতির ভয়াবহতা থেকে সুরক্ষা দেয়। ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের আইলা—এই দুই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। এরপর ফণী ও বুলবুল (২০১৯), আম্পান (২০২০) এবং ইয়াস (২০২১) সহ একাধিক শক্তিশালী ঝড় আঘাত হানে। প্রতিবারই সুন্দরবন প্রকৃতির রুদ্ররূপ থেকে আমাদের রক্ষা করেছে। রেমাল ঘূর্ণিঝড়ের সময়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সুন্দরবন আমাদের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে আবারও দেশকে সুরক্ষা দিয়েছে। তবে এই সুরক্ষার জন্য বনটির নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যকে বড় মূল্য দিতে হয়। বনজ উদ্ভিদ ও প্রাণীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের বাঁচায়।

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যদি সুন্দরবন বেঁচে থাকে, বাংলাদেশও বেঁচে থাকবে। কিন্তু সুন্দরবনের যত্ন নেবে কে? ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ। তখন সুন্দরবনের অবস্থা কী হবে? উন্নয়নের নামে কি এটিকে বলির পাঁঠা বানানো হবে? আমরা এমন উন্নয়ন চাই না, যা আমাদের এই ‘রক্ষাকারী মা’কে ধ্বংস করে দেয়।
২০১২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াইল্ডটিম (পূর্বের ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ) বাংলাদেশ বন বিভাগের সহযোগিতায় “সুন্দরবন মায়ের মতো” নামে একটি স্থানীয় প্রচারণা শুরু করে। এতে র্যালি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ঢাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রধান বন সংরক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। ঢাকা ও খুলনার শিল্পী ও সেলিব্রিটিরাও অনুষ্ঠানে পরিবেশনা করেন। এর লক্ষ্য ছিল বাঘ সংরক্ষণ এবং সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। একইসঙ্গে এটি কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহের উৎস। ওয়াইল্ডটিমের লক্ষ্য হলো সুন্দরবনের আবাসস্থল ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করা। এ জন্য তারা “সুন্দরবন মায়ের মতো” প্রচারণার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বনটির সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছে। এই উদ্যোগ মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে এবং বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর হুমকি কমাতে সহায়তা করেছে।

এই প্রচারণার ধারাবাহিকতায় ওয়াইল্ডটিম “ইকে সুন্দরবন মিউজিয়াম অ্যান্ড ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার” প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সুন্দরবনের গল্প তুলে ধরে এবং এর জীববৈচিত্র্য ও মানুষের কণ্ঠকে সামনে আনে। বাংলাদেশ বন বিভাগ, জার্মান সহযোগিতা, আইইউসিএনের সমন্বিত বাঘ আবাস সংরক্ষণ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এটি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এই কেন্দ্র সুন্দরবনের বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
এই কেন্দ্রটি সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারগুলোর একটি, মোংলার কাছে চাঁদপাই রেঞ্জের জয়মনি গ্রামে অবস্থিত ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টারের ভেতরে অবস্থিত। এখানে দর্শনার্থীদের থাকার ব্যবস্থা এবং প্রায় ১২০ জনের জন্য সম্মেলন কক্ষ রয়েছে। এই কেন্দ্র মানুষের জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সুন্দরবন সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াবে।
ফকির এবং পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম 



















