যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে পানিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তেলের মতোই কৌশলগত গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে পানির উৎস, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। একই সঙ্গে ইরানও গভীর পানি সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পানির নির্ভরতা: এক নতুন ঝুঁকি
আরব উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করার প্রযুক্তির (ডেসালিনেশন) ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে পানযোগ্য পানির ৯০ শতাংশের বেশি আসে এই পদ্ধতি থেকে। ওমানে প্রায় একই অবস্থা, সৌদি আরবে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪০ শতাংশ পানি এভাবেই সরবরাহ করা হয়।
এই নির্ভরতা নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও শিল্পকারখানা এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পানি স্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ বড় ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় এগুলো সহজেই ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
একটি স্থাপনা ধ্বংস মানেই বিপর্যয়
২০০৮ সালের এক মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়েছিল, সৌদি আরবের জুবাইল ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট একাই রাজধানী রিয়াদের ৯০ শতাংশের বেশি পানির চাহিদা পূরণ করত। যদি এই প্ল্যান্ট বা এর বিদ্যুৎ ও পাইপলাইন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যেই শহরটি খালি করতে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সৌদি সরকারের বর্তমান কাঠামো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে—এমন সতর্কতাও সেই বার্তায় উল্লেখ ছিল।
ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ, কিন্তু এখনও ঘাটতি
২০০৬ সাল থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রায় ৫৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে। সৌদি আরব এখন ছোট ও ছড়িয়ে থাকা প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ পানি সংগ্রহ করে। আবুধাবি ও কাতার কৌশলগত পানি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
এই বিনিয়োগের ফলে কিছুটা সুরক্ষা তৈরি হলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। এখনও বেশিরভাগ পানি আসে অল্প কয়েকটি বড় স্থাপনা থেকে। সংরক্ষণ ব্যবস্থাও দুর্বল। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০৩৬ সালের মধ্যে মাত্র দুই দিনের স্বাভাবিক ব্যবহারের সমান পানি মজুতের লক্ষ্য নিয়েছে, যা কঠোর রেশনিং করলে এক মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। ছোট দেশগুলো, যেমন বাহরাইন, আরও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
যুদ্ধ ও পানি অবকাঠামো: বাড়ছে সংঘর্ষের মাত্রা
সাধারণত বেসামরিক পানি অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষই এমন হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের কেশম দ্বীপের একটি পানি স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান বাহরাইনের একটি স্থাপনায় আঘাত হানে। এমনকি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা হলে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
ইরানের নিজস্ব পানি সংকট
উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো ইরান ডেসালিনেশনের ওপর এতটা নির্ভরশীল নয়, কিন্তু দেশটি নিজেই তীব্র পানি সংকটে ভুগছে। দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ নির্মাণ এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে পানির ভাণ্ডার দ্রুত কমে গেছে। বর্তমানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইরানি নাগরিক পানি স্বল্পতার মুখোমুখি।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পানিবিষয়ক সহযোগিতাও দুর্বল করে দিচ্ছে। একদিকে ইরান চাইলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য পানি প্রবাহ বন্ধ করতে পারে, অন্যদিকে নিজের দেশেই পানির ঘাটতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তেলের পাশাপাশি পানিও কৌশলগত অস্ত্র
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে পানির গুরুত্ব তেলের সমতুল্য হয়ে উঠতে পারে। অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা, সীমিত মজুত এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা—সব মিলিয়ে পানি এখন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং কৌশলগত অস্ত্র হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















