০৭:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানবপাচার মামলায় সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিনের ৬ দিনের নতুন রিমান্ড মমতার তোপে বিজেপি: বাংলা ধ্বংসের চক্রান্তের অভিযোগ, ভোটের আগে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপ ভারতের জঙ্গলে দীর্ঘতম মাওবাদী বিদ্রোহ শেষের পথে? নিরাপত্তা অভিযানে বদলে যাচ্ছে বাস্তবতা জ্বালানি সংকটে বড় সিদ্ধান্ত: পিকেএসএফের জ্বালানি ব্যবহার অর্ধেকে নামানোর ঘোষণা সাইবার যুদ্ধে নতুন যুগ: আক্রমণাত্মক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা সিআইএতে অস্থিরতা: রাজনীতির ছায়ায় ভেঙে পড়ছে গোয়েন্দা সংস্থার মনোবল যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফরে গেলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ডিএইচএসে নতুন মুখ, পুরনো সংকট: মুলিনের নরম ভাবমূর্তি কি পারবে উত্তপ্ত বাস্তব সামাল দিতে? যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী লবির নতুন কৌশল, উল্টো চাপেই বাড়ছে বিতর্ক ভূমধ্যসাগরে মর্মান্তিক মৃত্যু: সুনামগঞ্জের ১২ তরুণসহ ১৮ বাংলাদেশি প্রাণ হারালেন

ইরানের নতুন শাসকগোষ্ঠী: ধর্মতন্ত্র থেকে সামরিক শাসনের দিকে মোড়

ইরানের চলমান যুদ্ধ দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। একসময় ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল এই রাষ্ট্র এখন ধীরে ধীরে সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি করার প্রকৃত ক্ষমতা এখন কার হাতে।

নেতৃত্বের শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ধরা হয় মোজতবা খামেনিকে। কিন্তু তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তার অবস্থান নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে—কেউ বলছে তিনি অসুস্থ, কেউ বলছে তিনি মারা গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যদি প্রকাশ্যে আসেনও, তবে তা হবে কেবল প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবে। বাস্তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্যদের হাতে চলে গেছে।

আইআরজিসির উত্থান
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্যের এই বাহিনী শুধু যুদ্ধ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। অনেকের মতে, যুদ্ধ আইআরজিসির ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করেছে এবং তারা এখন কার্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ধর্মতন্ত্র থেকে সামরিক কাঠামো
ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে সরে এসে সামরিক শাসনের মতো কাঠামোতে রূপ নিচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হওয়ার কথা, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই নিয়ম কার্যত উপেক্ষিত। আইআরজিসির প্রভাবেই নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কৌশল নির্ধারণে সামরিক প্রাধান্য
দেশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এখন মূলত সামরিক নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই পরিষদ যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা পরিষদ গঠিত হয়েছে, যা সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করছে। এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইআরজিসির অপারেশনাল সদর দপ্তর।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও আলোচনার অনিশ্চয়তা
যদিও আইআরজিসি শক্তিশালী, তবে এটি একক মতাদর্শে পরিচালিত নয়। এর মধ্যে সংস্কারপন্থী, বাস্তববাদী এবং কঠোরপন্থী—এই তিন ধরনের গোষ্ঠী রয়েছে। কিছু গোষ্ঠী আলোচনায় আগ্রহী হলেও, কঠোরপন্থীরা কোনো আপস করতে নারাজ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি কার্যকর করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিকেন্দ্রীকরণ ও যুদ্ধকৌশল
আইআরজিসি তাদের শক্তি ধরে রাখতে বিকেন্দ্রীকরণ কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশকে ৩১টি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলে অস্ত্র ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হলেও এই ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। একইভাবে, তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই কৌশল ভবিষ্যতে গেরিলা যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতকে জটিল করে তুলতে পারে।

বাহ্যিক হুমকি ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে কুর্দি ও অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে আইআরজিসির শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া এবং হামলার কারণে সেই হুমকি আপাতত কমে গেছে।

একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্রোহের আগ্রহও কমে এসেছে। যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা মানুষকে হতাশ করেছে। অনেকেই এখন মনে করছেন, যুদ্ধের পর সরকার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

উপসংহার
ইরানে এখন যে পরিবর্তন ঘটছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয়, কাঠামোগতও। ধর্মীয় নেতৃত্বের জায়গায় সামরিক শক্তির উত্থান দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও এই নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ফেলবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানবপাচার মামলায় সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিনের ৬ দিনের নতুন রিমান্ড

ইরানের নতুন শাসকগোষ্ঠী: ধর্মতন্ত্র থেকে সামরিক শাসনের দিকে মোড়

০৫:৫১:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

ইরানের চলমান যুদ্ধ দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। একসময় ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল এই রাষ্ট্র এখন ধীরে ধীরে সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি করার প্রকৃত ক্ষমতা এখন কার হাতে।

নেতৃত্বের শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ধরা হয় মোজতবা খামেনিকে। কিন্তু তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তার অবস্থান নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে—কেউ বলছে তিনি অসুস্থ, কেউ বলছে তিনি মারা গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যদি প্রকাশ্যে আসেনও, তবে তা হবে কেবল প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবে। বাস্তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্যদের হাতে চলে গেছে।

আইআরজিসির উত্থান
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্যের এই বাহিনী শুধু যুদ্ধ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। অনেকের মতে, যুদ্ধ আইআরজিসির ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করেছে এবং তারা এখন কার্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ধর্মতন্ত্র থেকে সামরিক কাঠামো
ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে সরে এসে সামরিক শাসনের মতো কাঠামোতে রূপ নিচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হওয়ার কথা, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই নিয়ম কার্যত উপেক্ষিত। আইআরজিসির প্রভাবেই নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কৌশল নির্ধারণে সামরিক প্রাধান্য
দেশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এখন মূলত সামরিক নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই পরিষদ যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা পরিষদ গঠিত হয়েছে, যা সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করছে। এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইআরজিসির অপারেশনাল সদর দপ্তর।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও আলোচনার অনিশ্চয়তা
যদিও আইআরজিসি শক্তিশালী, তবে এটি একক মতাদর্শে পরিচালিত নয়। এর মধ্যে সংস্কারপন্থী, বাস্তববাদী এবং কঠোরপন্থী—এই তিন ধরনের গোষ্ঠী রয়েছে। কিছু গোষ্ঠী আলোচনায় আগ্রহী হলেও, কঠোরপন্থীরা কোনো আপস করতে নারাজ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি কার্যকর করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিকেন্দ্রীকরণ ও যুদ্ধকৌশল
আইআরজিসি তাদের শক্তি ধরে রাখতে বিকেন্দ্রীকরণ কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশকে ৩১টি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলে অস্ত্র ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হলেও এই ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। একইভাবে, তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই কৌশল ভবিষ্যতে গেরিলা যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতকে জটিল করে তুলতে পারে।

বাহ্যিক হুমকি ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে কুর্দি ও অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে আইআরজিসির শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া এবং হামলার কারণে সেই হুমকি আপাতত কমে গেছে।

একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্রোহের আগ্রহও কমে এসেছে। যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা মানুষকে হতাশ করেছে। অনেকেই এখন মনে করছেন, যুদ্ধের পর সরকার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

উপসংহার
ইরানে এখন যে পরিবর্তন ঘটছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয়, কাঠামোগতও। ধর্মীয় নেতৃত্বের জায়গায় সামরিক শক্তির উত্থান দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও এই নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ফেলবে।