বতসোয়ানা তার হীরাভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে চায়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হীরা কোম্পানি ডি বিয়ার্সে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর মাধ্যমে। তবে এই পরিকল্পনা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে নাকি নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
হীরার ওপর ভর করেই উত্থান
বতসোয়ানার অর্থনৈতিক ইতিহাস ডি বিয়ার্সের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। স্বাধীনতার এক বছর পর, ১৯৬৭ সালে দেশে বড় হীরার খনি আবিষ্কৃত হয়। এরপর ডি বিয়ার্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘ডেবসোয়ানা’ প্রতিষ্ঠা করে দেশটি।
হীরার আয় ব্যবহার করে বতসোয়ানা অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ করেছে। ১৯৭০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশটির অর্থনীতি বছরে গড়ে ১০.৬% হারে বেড়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধি।
নতুন পরিকল্পনা: ডি বিয়ার্সে অংশ বাড়ানো
বর্তমানে বতসোয়ানা ডি বিয়ার্সে তাদের ১৫% অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে অন্তত ২৫% করতে চায়। এতে তারা কোম্পানির বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
এই উদ্যোগের পেছনে আরেকটি কারণ হলো—ডি বিয়ার্সের সম্ভাব্য বিক্রি। মূল কোম্পানি অ্যাংলো আমেরিকান এটি বিক্রি করতে পারে, আর এতে অন্য দেশ, বিশেষ করে অ্যাঙ্গোলার আগ্রহ বতসোয়ানাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
হীরার বাজারে ধস
সম্প্রতি প্রাকৃতিক হীরার দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। এর প্রধান কারণ:
- সস্তা ল্যাব-তৈরি হীরার জনপ্রিয়তা
- যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে বিয়ের সংখ্যা কমে যাওয়া
এর ফলে ডি বিয়ার্সের মূল্য ২০১১ সালের ১২.৭৫ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিতে চাপ ও সংকট
হীরা বতসোয়ানার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- জিডিপির প্রায় ২৫%
- রপ্তানির প্রায় ৮০%
কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে হীরার বাজারে ধস নামায় দেশের প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। সরকার সঞ্চয় তহবিল ব্যবহার করছে, ঋণ বাড়ছে এবং বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৯% ছাড়িয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দেশটির ক্রেডিট রেটিংও কমিয়েছে।
সরকার কী আশা করছে?
সরকার মনে করছে, ডি বিয়ার্সে বেশি অংশীদার হলে তারা শুধু খনন নয়, পুরো হীরা শিল্পের মূল্যচক্র থেকে লাভ করতে পারবে।
প্রেসিডেন্ট ডুমা বোখো বলেছেন, দেশ শুধু সম্পদের রক্ষক নয়—এর মূল্য সৃষ্টিকারীও হতে চায়।
সমালোচকদের উদ্বেগ
বিশ্লেষকরা এই পরিকল্পনা নিয়ে তিনটি বড় ঝুঁকির কথা বলছেন:
১. আর্থিক ঝুঁকি
দেশটির বর্তমান আর্থিক অবস্থায় বড় বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভবিষ্যৎ হীরা বিক্রির ওপর নির্ভর করে ঋণ নেওয়া সমস্যাকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
২. মূল্যচক্রে সীমিত লাভ
হীরা কাটিং ও পালিশের ক্ষেত্রে ভারতকে টেক্কা দিতে পারেনি বতসোয়ানা। খুচরা ব্যবসাতেও ডি বিয়ার্স তেমন সফল নয়। ফলে অতিরিক্ত অংশীদারিত্ব থেকে বেশি লাভের নিশ্চয়তা নেই।
৩. বৈচিত্র্যের অভাব
হীরার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অন্যান্য শিল্পকে দুর্বল করে দিয়েছে—যাকে ‘ডাচ ডিজিজ’ বলা হয়। সমালোচকরা মনে করেন, নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করাই বেশি জরুরি।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত ডি বিয়ার্স কোনো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি হতে পারে, যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাই প্রধান নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এ অবস্থায় বতসোয়ানার জন্য পুরোপুরি ঝুঁকি নিয়ে বড় বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ নাও হতে পারে।
বতসোয়ানা হীরার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই খাতে অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হয়তো এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—হীরার পেছনে ছুটে দেশটি কি সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, নাকি এটি এমন এক বিনিয়োগ, যার ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















