ইন্দোনেশিয়ায় চীনা উদ্যোক্তা ও কোম্পানিগুলোর দ্রুত বিস্তার দেশটির অর্থনীতি ও ব্যবসার চিত্র পাল্টে দিচ্ছে। ছোট স্টার্টআপ থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সবখানেই এখন দৃশ্যমান চীনের শক্ত উপস্থিতি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই বৃহৎ বাজারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্র, যেখানে প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং খনিজসম্পদকে ঘিরে চলছে বড় ধরনের বিনিয়োগ।
চীনা উদ্যোক্তাদের নতুন গন্তব্য
চীনের বিনিয়োগকারী ডনি ঝাং ২০১৫ সালে প্রথম ইন্দোনেশিয়ায় এসে সম্ভাবনা দেখে বিস্মিত হন। পরে তিনি ২০২১ সালে “ইয়াপ” নামে একটি ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাপ চালু করেন, যা মূলত ব্যাংকসেবার বাইরে থাকা শ্রমজীবী মানুষের জন্য তৈরি। বর্তমানে এই অ্যাপের সক্রিয় ব্যবহারকারী ২০ লাখের বেশি এবং এটি ইতোমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
ইন্দোনেশিয়া কেন আকর্ষণীয়—এর উত্তর সহজ। বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত বাড়তে থাকা স্মার্টফোন ব্যবহার এবং ভৌগোলিকভাবে চীনের কাছাকাছি অবস্থান উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে।
বাড়ছে চীনা অভিবাসী ও ব্যবসা
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় এক লাখের বেশি চীনা নাগরিক বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন, যা অন্যান্য সব দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেকেই প্রথমে পর্যটক ভিসায় এসে ব্যবসা শুরু করেন।
নতুন আসা চীনারা রেস্তোরাঁ, বিনোদন কেন্দ্র, সম্পত্তি ব্যবসা থেকে শুরু করে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র—বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যবসা সরাসরি চীনের শহর থেকে এনে এখানে স্থাপন করা হচ্ছে, কারণ নিজ দেশে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে এবং অর্থনীতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে চীনের দাপট
ইন্দোনেশিয়ার রাস্তায় কয়েক বছর আগেও চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি দেখা যেত না। এখন তা সাধারণ দৃশ্য। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির ৯০ শতাংশের বেশি ছিল চীনা ব্র্যান্ডের দখলে।
বিওয়াইডি পশ্চিম জাভায় একটি বড় কারখানা নির্মাণ করছে, যেখানে বছরে দেড় লাখ গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে জিএসি এইয়ন, এক্সপেং এবং উলিং ইতোমধ্যে স্থানীয় উৎপাদন শুরু করেছে।

নিকেল সম্পদ ও ব্যাটারি শিল্প
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিকেল ভাণ্ডার, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে অপরিহার্য। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনা কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে দেশটির নিকেল পরিশোধন শিল্পের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি নির্মাতা ক্যাটিএল পশ্চিম জাভায় সমন্বিত ব্যাটারি কারখানা নির্মাণ করছে। পাশাপাশি হুয়াইউ কোবাল্ট একটি বড় প্রকল্পে প্রধান অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে। দুই প্রকল্পে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
নতুন শহর ও চীনা সংস্কৃতির বিস্তার
জাকার্তার উত্তরে সমুদ্র ভরাট করে তৈরি হওয়া পান্তাই ইন্দাহ কাপুক এখন চীনা উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় আবাসস্থল। এখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট ও শপিং সেন্টার, যেখানে চীনা ব্র্যান্ডের আধিপত্য স্পষ্ট।
মিক্সু এখন ইন্দোনেশিয়ায় ২,৬০০টির বেশি আউটলেট চালাচ্ছে, যা চীনের বাইরে তাদের সবচেয়ে বড় বাজার।
অতীতের ভয় ও ভবিষ্যতের আশা
তবে সবকিছু এত সহজ নয়। ১৯৯৮ সালের দাঙ্গার স্মৃতি এখনো অনেক চীনা বংশোদ্ভূত ইন্দোনেশীয়দের মনে ভীতি তৈরি করে। তারা আশঙ্কা করেন, নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে এই ধরনের উন্নত এলাকাগুলোই প্রথম লক্ষ্য হতে পারে।
অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের চীনা উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন, ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎ চীনের অতীতের মতোই দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোবে।
সামগ্রিক চিত্র
সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় চীনা বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও আনছে। প্রযুক্তি, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে এই প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও গভীর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















