এশিয়ার দ্রুত নগরায়নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট—সাশ্রয়ী ও মানসম্মত আবাসনের অভাব। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশে শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না বাসযোগ্য ঘর। ফলে বড় শহরগুলোতে দূষণ, যানজট ও অপরাধের পাশাপাশি আবাসন সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নগরায়ন বাড়ছে, বাড়ছে সংকট
দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে, যেখানে উত্তর আমেরিকায় এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে আরও বড় নগর বিস্ফোরণ আসছে। কিন্তু শহরগুলো এই চাপ নিতে প্রস্তুত নয়।
এশিয়ায় প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ বস্তিতে বা নিম্নমানের বাসস্থানে থাকে। অনেকের ঘরে নেই বিদ্যুৎ, পানি বা পর্যাপ্ত জায়গা। ফিলিপাইনে প্রয়োজন প্রায় ৭০ লাখ নতুন ঘর, ইন্দোনেশিয়ায় ঘাটতি ২ কোটি ৭০ লাখ, আর ভারতে এই সংখ্যা পৌঁছাতে পারে ৪ কোটি ৭০ লাখ পর্যন্ত।
আকাশছোঁয়া দামের বাড়ি, নাগালের বাইরে মানুষ
যেসব ভালো মানের ফ্ল্যাট পাওয়া যায়, সেগুলোর দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একটি শহরে মানসম্মত ফ্ল্যাটের দাম গড় পরিবারের আয়ের প্রায় ২০ গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে নিম্নমানের বাসস্থানে থাকতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। অনেক মানুষ শহরে কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও খারাপ জীবনযাপনের কারণে গ্রামেই থেকে যাচ্ছে, এমনকি কম আয়েও।
আবাসন মান উন্নত হলে বদলাবে জীবন
গবেষণা বলছে, ভালো মানের আবাসন মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। এতে অসুস্থতা কমে, শিশুদের স্কুলে যাওয়া বাড়ে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। বস্তির পরিবর্তে উন্নত ঘর তৈরি হলে আয়ু বাড়ে, শিক্ষার হার বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
নীতির জটিলতা ও বাস্তব বাধা
অনেক শহরে জমি ব্যবহারের কঠোর নিয়মের কারণে বড় পরিসরে সাশ্রয়ী বাড়ি তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভবনের উচ্চতা বা ব্যবহার নিয়ে সীমাবদ্ধতা থাকায় আবাসন সরবরাহ কমে যায় এবং মানুষ বস্তিতে ঠেলে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ডেভেলপাররা সাধারণত বিলাসবহুল প্রকল্পে বেশি আগ্রহী, কারণ এতে লাভ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে নতুন তৈরি বাড়িও খালি পড়ে থাকে, কারণ সেগুলো বিনিয়োগ হিসেবে কেনা হয়, বসবাসের জন্য নয়।

ঋণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা
এশিয়ার অনেক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, ফলে তারা সহজে ঋণ পান না। উন্নত দেশের তুলনায় আবাসন ঋণের হার এখানে অনেক কম, যা বাড়ি কেনার সুযোগকে আরও সীমিত করে দেয়।
সরকারের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
সরকার অনেক জায়গায় সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। বড় শহরের বিপুল জনসংখ্যার জন্য এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে সরাসরি সবকিছু না করে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। জমি সস্তায় দেওয়া, নির্মাণে ভর্তুকি এবং কর সুবিধা দিলে সাশ্রয়ী আবাসন বাড়তে পারে।
ভাড়া ব্যবস্থার গুরুত্ব
নতুন শহরে আসা মানুষের জন্য বাড়ি কেনা নয়, বরং ভাড়া নেওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত। তাই স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার ব্যবস্থা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে নতুনরা সহজে শহরে স্থায়ী হতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্বল ঘরে বসবাসকারী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনই পরিকল্পিতভাবে আবাসন উন্নয়ন না করলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















