জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা তৈরি করেছে ইসরায়েল-আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধ। এই সংকটে অনেক দেশ প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল ব্রাজিল। দীর্ঘ কয়েক দশকের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ফলে দেশটি এমন এক শক্তিশালী বায়োফুয়েল খাত গড়ে তুলেছে, যা এখন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শক্তিশালী বায়োফুয়েল অবকাঠামো
ব্রাজিল বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইথানল উৎপাদক এবং তৃতীয় বৃহত্তম বায়োডিজেল উৎপাদক। দেশটির জ্বালানিতে বাধ্যতামূলকভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ ইথানল এবং ১৫ শতাংশ বায়োডিজেল মেশানো হয়, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ।
দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ হালকা যানবাহনে এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা খাঁটি পেট্রোল থেকে শুরু করে ১০০ শতাংশ ইথানল পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারে। ফলে ব্রাজিলের মানুষ জ্বালানি ব্যবহারে অনেক বেশি নমনীয়তা পায়।
মূল্যবৃদ্ধি কম রাখার কৌশল
যুদ্ধ শুরুর পর ব্রাজিলে পেট্রোলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে এই বৃদ্ধি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এই পার্থক্যের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাস অতিরিক্ত খরচের একটি অংশ নিজেই বহন করছে। পাশাপাশি, বায়োফুয়েলের প্রতিযোগিতামূলক দামও বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।
বায়োফুয়েলের বাড়তি সুবিধা
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর প্রথমবারের মতো বায়োডিজেলের গড় দাম আমদানিকৃত ডিজেলের চেয়ে কম হয়েছে। ইথানলের দামও খুব সামান্য, মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে।
সরকার এখন পেট্রোলে ইথানলের মিশ্রণ ৩২ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বায়োডিজেলে কর ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই হার আরও বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ (ইথানল) এবং ২৫ শতাংশ (বায়োডিজেল) করার সম্ভাবনা যাচাই করতে তিন বছরের গবেষণা শুরু হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের পাসো ফুন্ডো শহরে ইতোমধ্যে নতুন ধরনের বায়োফুয়েল ব্যবহার করে ডিজেল প্রতিস্থাপনের পরীক্ষাও চলছে।
ইতিহাস: সংকট থেকে আত্মনির্ভরতা
ব্রাজিলের বায়োফুয়েল যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময়। তখন ১৯৭৩ সালের তেল সংকট দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলে দেয়।
সেই সময় সামরিক সরকার ‘প্রোঅ্যালকোল’ কর্মসূচি চালু করে, যেখানে আখ থেকে ইথানল উৎপাদন শুরু হয়। মাত্র এক দশকের মধ্যে নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির ৯৬ শতাংশই ইথানলে চলত।
২০০৩ সালে ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি চালু হওয়ার পর বায়োডিজেল উৎপাদনেও জোর দেওয়া হয়, যা মূলত সয়াবিনসহ বিভিন্ন বীজ থেকে তৈরি হয়।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বায়োফুয়েলকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার অন্যতম সমাধান হিসেবে দেখেন।
অর্থনীতি ও পরিবেশ—দুই দিকেই লাভ
ব্রাজিল বিশ্বের বড় তেল রপ্তানিকারক হলেও এখনও ১০ শতাংশ পেট্রোল এবং ২৫ শতাংশ ডিজেল আমদানি করে। বায়োফুয়েল এই নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করছে।
একই সঙ্গে এটি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে ভূমিকা রাখছে, আবার কৃষকদেরও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখছে, কারণ বায়োফুয়েলের কাঁচামাল আসে কৃষি খাত থেকেই।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
তবে সবকিছুই নিখুঁত নয়। যদি ইথানল খুব সস্তা হয়ে যায় এবং এর ব্যবহার বাড়ে, তাহলে এর দামও বাড়তে পারে। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়লে সার উৎপাদনের খরচ বাড়ে, যা বায়োফুয়েল উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবুও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ব্রাজিলের বায়োফুয়েল খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সয়াবিন সংগ্রহ মৌসুম এবং এপ্রিল-মে মাসে আখ ও ভুট্টা সংগ্রহের ফলে উৎপাদন দ্রুত বাড়বে। ধারণা করা হচ্ছে, এবার রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হবে, যা দামে আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশ্বে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতার চাহিদা
ব্রাজিলের এই সাফল্য অন্য দেশগুলোর নজর কেড়েছে। ভারত ও জাপান ইতোমধ্যে তাদের জ্বালানি খাতে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্রাজিলের বায়োফুয়েল মডেল এক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে উঠে আসছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















