মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান এক সময় উটের কাফেলায় পাড়ি দেওয়া পথিকদের দেশ ছিল। এখন সেই প্রান্তরে চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য—প্রায় সর্বত্র একই ব্র্যান্ডের গাড়ি। মার্কিন ব্র্যান্ড শেভ্রোলেট এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে স্থানীয়রা দেশটিকে মজা করে ‘শেভ্রোলেটস্তান’ বলে ডাকতে শুরু করেছে। তবে এই একচেটিয়া অবস্থান এখন ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, বিশেষ করে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থানের কারণে।
গাড়ির বাজারে শেভ্রোলেটের একচেটিয়া আধিপত্য
রাজধানী তাশখন্দে বিমানবন্দর থেকে বের হলেই দেখা যায় সারি সারি শেভ্রোলেট কোবাল্ট। ট্যাক্সি ডাকলেও একই ধরনের গাড়ির ভিড়ে নিজের গাড়ি চেনা কঠিন হয়ে যায়। গত বছর দেশে বিক্রি হওয়া প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার গাড়ির মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশই ছিল শেভ্রোলেট। এর মধ্যে কোবাল্ট একাই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাজার দখল করে আছে। শহরের বাইরে ছোট শহরগুলোর রাস্তায় আবার শেভ্রোলেট দামাস নামের ছোট ভ্যানের আধিপত্য, যা মোট বিক্রির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
রাষ্ট্রীয় নীতিতে গড়ে ওঠা গাড়ির সাম্রাজ্য
এই একরকম বাজার পরিস্থিতি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। সোভিয়েত-পরবর্তী সময় ১৯৯২ সালে দেশের নেতা ইসলাম কারিমভ একটি নিজস্ব গাড়ি শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বে যাত্রা শুরু হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেলে শেভ্রোলেটের মালিক জেনারেল মোটরস এগিয়ে আসে। সরকার আমদানিকৃত গাড়ির ওপর শতভাগেরও বেশি শুল্ক আরোপ করে দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দেয়। ২০১৯ সালে জেনারেল মোটরস অংশীদারিত্ব থেকে সরে গেলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান উজঅটো মোটরস এখনও শেভ্রোলেট উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

নীতির পরিবর্তন, বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থান
২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসা শাভকাত মিরজিয়োয়েভ পূর্বসূরির তুলনায় কিছুটা উদার নীতি গ্রহণ করেন। তিনি আমদানিকৃত গাড়ির ওপর শুল্ক অনেকাংশে বজায় রাখলেও বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে তা কমিয়ে দেন, যার ফলে দূষণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার হয়। ২০২২ সালে যেখানে প্রায় কোনো বৈদ্যুতিক গাড়ি ছিল না, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট বিক্রির প্রায় ৫ শতাংশে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে।
চীনের আগ্রাসন ও নতুন প্রতিযোগিতা
রাষ্ট্রীয় সমর্থন এখনও শেভ্রোলেটের দিকে ঝুঁকে থাকলেও সরকার চীনা গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে। ২০২৪ সালে জিজাখ অঞ্চলে একটি চীনা কোম্পানি কারখানা স্থাপন করেছে। ফলে রাজধানীর রাস্তায় ধীরে ধীরে বাড়ছে আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ির উপস্থিতি।
এ পরিবর্তন শুধু বাজারেই নয়, পরিবেশেও প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালে তাশখন্দের বায়ুদূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্য মানের তুলনায় ছয় গুণ বেশি ছিল। বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার সেই পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শহরের বাইরে এখনও শেভ্রোলেটের দাপট
তবে পরিবর্তনের গতি এখনও শহরকেন্দ্রিক। গ্রামাঞ্চল ও দূরবর্তী এলাকায় চার্জিং অবকাঠামোর অভাব থাকায় শেভ্রোলেটই প্রধান ভরসা হয়ে রয়েছে। তবুও ধীরে ধীরে চীনা গাড়ি নির্মাতারা নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে—একেকটি প্রান্তর পেরিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















