চলতি অর্থবছরে ব্যয় মেটাতে সরকারের উপর চাপ ক্রমবর্ধমান। জুলাই ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি কমেছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির চাপ, তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্সের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি সংকটের মুখে।
অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ বৃদ্ধি
সাড়ে আট মাসে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার তিনশ ছাপ্পানব্বই কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৯৮ হাজার পাঁচশ ছাব্বিশ কোটি টাকা। তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভর্তুকি চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। দেশীয় বাজারে দাম বৃদ্ধির অনুপস্থিতিতে সরকারকে বড় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হবে, যার মধ্যে ডিজেলের অংশ ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
রপ্তানি আয় ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়
টানা আট মাসে রপ্তানি আয় কমছে। মার্চে গত বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৮.৭ শতাংশ, আর প্রথম নয় মাসে কমেছে ৪.৮৫ শতাংশ। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে পারিবারিক কার্ড চালু করা হয়েছে। আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যয় আরও ঋণ বৃদ্ধি করতে পারে।
রেমিট্যান্সের অবদান ও ঝুঁকি
মার্চে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। যুদ্ধের আতঙ্ক ও ঈদুল ফিতরের কারণে প্রবাহ বেড়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে নতুন শ্রমিক প্রেরণের অনিশ্চয়তা এবং চাকরির অনিশ্চয়তা রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে গেছে। রাজস্ব আয় গত বছরের তুলনায় ১২-১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে শ্লথগতির অর্থনীতিতে বড় প্রবৃদ্ধির আশা কম। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে সরকারকে রিজার্ভ থেকে অর্থ উত্তোলন বা মুদ্রা ছাপাতে হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে।
সরকারের চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকার তিন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে ব্যয় মেটানোর বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজস্ব আয় ও লক্ষ্যমাত্রা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ের মধ্যে রাজস্ব আদায় হয়েছে দুই লাখ চুয়ানব্বই হাজার তিনশ ত্রিশ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম। আগের বছরের তুলনায় আয় বেড়েছে ১২.৩৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ নিরানব্বই হাজার কোটি টাকা, পরে পঞ্চানব্বই হাজার কোটি বৃদ্ধি করে পাঁচ লাখ চৌনব্বই হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত ও বিদেশি ঋণ
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাত থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি এবং ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য। চলতি অর্থবছরের সাড়ে আট মাসে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া ঋণ আগের বছরের তুলনায় তিন দশমিক পাঁচ গুণ বেড়েছে।
ডিসেম্বরে বিদেশি ঋণ বেড়ে একশত তেরো দশমিক পঞ্চানব্বই বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুনভাবে দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তেলের সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতি সতর্কতা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স এবং তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালির বাধা এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের সরবরাহ সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। সক্ষমতা অনুযায়ী অর্থায়ন করা জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালানোর জন্য ভর্তুকি নির্ধারণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 




















