প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ব্রিটেনের গোলাবারুদ প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিল। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আবারও যুক্তরাজ্য এক ধরনের ‘শেল সংকট’-এর মুখোমুখি।
দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিবিদরা একটি জটিল প্রশ্নের সমাধান খুঁজে আসছেন—কীভাবে শান্তিকালে একটি দেশের অর্থনীতি সচল রেখে এমন একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলা যায়, যা যেকোনো সময় যুদ্ধে নামার জন্য প্রস্তুত। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে, বড় কোনো যুদ্ধের অনেক বছর পরও পশ্চিমা দেশগুলো একই সমস্যায় পড়েছে—তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারছে না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও পরিস্থিতি ছিল প্রায় একই। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে যুদ্ধ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। রেলপথের মাধ্যমে দ্রুত সৈন্য পরিবহন, কারখানায় ব্যাপক উৎপাদন, টেলিগ্রাফের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ—এসব প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন বদলে দেয়। আলফ্রেড নোবেলের ডিনামাইট আবিষ্কার, ধোঁয়াবিহীন গানপাউডার, উন্নত অস্ত্র ও অপটিক্যাল যন্ত্রপাতি—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

১৯০০ সালের মধ্যে রেলপথই ছিল যুদ্ধ পরিচালনার প্রধান মাধ্যম। বিশাল সেনাবাহিনীকে দ্রুত স্থানান্তর ও সরবরাহ বজায় রাখতে এটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে অফিসারদের প্রশিক্ষণেও পরিবর্তন আসে—তারা বড় আকারের সেনা পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ পেতে থাকে।
ট্রেঞ্চ যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষা ভাঙতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ দরকার হতো। নতুন নতুন প্রযুক্তি—যেমন মেশিনগান, সাবমেরিন, প্রাথমিক বিমান, দ্রুতগতির কামান—যুদ্ধে যুক্ত হয়। কিন্তু কোন প্রযুক্তি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, তা তখনও পরিষ্কার ছিল না।
দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ার যুদ্ধে ব্রিটেন তুলনামূলক কম গোলাবারুদ ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ১৯১৪ সালের কয়েক মাসেই তারা একই পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করে ফেলে। ১৯১৫ সালে এসে দেখা যায়, জার্মান ট্রেঞ্চ ভাঙতে বিপুল গোলাবর্ষণ দরকার। কিন্তু ব্রিটেনের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ছিল না।
১৯১৫ সালের মার্চ মাসে সেনাপ্রধান জন ফ্রেঞ্চ বাধ্য হয়ে সংবাদমাধ্যমে গোলাবারুদ ঘাটতির কথা জানান। সরকার প্রথমে দাবি করেছিল যে মজুদ যথেষ্ট, কিন্তু বাস্তবে তা সত্য ছিল না। অবার্স রিজ যুদ্ধে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ না থাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। এরপর সংবাদমাধ্যমে ‘শেল সংকট’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
মে মাসে ফেস্টুবের যুদ্ধে পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘ সময় ধরে গোলাবর্ষণ করার। কিন্তু বাস্তবে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই উচ্চ-বিস্ফোরক শেল ফুরিয়ে যায়। ফলে আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ে।

নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করতে আর্মার-পিয়ার্সিং শেল দরকার হলেও স্থল লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে উচ্চ-বিস্ফোরক শেল প্রয়োজন ছিল। সেনাবাহিনীও ট্রেঞ্চ ধ্বংস করতে এই ধরনের শেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
তখনকার নেতৃত্ব বুঝতে পারে—যুদ্ধে সফল হতে হলে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ প্রয়োজন। কিন্তু সরকার বেসরকারি কারখানাগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করতে দ্বিধায় ছিল। কারণ এতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারত।
এদিকে গ্যালিপলি অভিযানে নৌবাহিনী অপ্রত্যাশিতভাবে প্রচুর উচ্চ-বিস্ফোরক শেল ব্যবহার করতে শুরু করে। স্থলবাহিনী যখন আক্রমণ শুরু করে, তখন তাদের হাতে ছিল খুবই সীমিত গোলাবারুদ।
ব্রিটেনের কারখানাগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার শেল তৈরি করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। অন্যদিকে জার্মানি প্রতিদিন কয়েক লক্ষ শেল উৎপাদন করছিল। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটেন পিছিয়ে পড়ে।
১৯১৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্রিটেন মাত্র ২০ লাখ শেল উৎপাদন করতে পেরেছিল। এই পরিস্থিতি জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং সরকার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
এই শেল সংকট দেখিয়ে দেয়—আধুনিক যুদ্ধে শুধু সৈন্য নয়, শিল্প উৎপাদন ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পিটার ক্যাডিক-অ্যাডামস 



















