চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে বড় চক্রটি এখন অস্বাভাবিক চাপে পড়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে নতুন অস্থিরতা। এর প্রভাব দ্রুতই দেশের বাজার ব্যবস্থায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিদিনের স্বাভাবিক চিত্রে বড় পরিবর্তন
চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য বহন করে। বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে বাইরে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও অফডক থেকে বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রতিদিন বন্দরে প্রবেশ করে। এর সঙ্গে খাতুনগঞ্জ, রেয়াজউদ্দিন বাজার, পাহাড়তলী চালের আড়ত এবং সীতাকুণ্ড, কালুরঘাট, নাসিরাবাদ ও ইপিজেড এলাকার কারখানাগুলোর পরিবহন যোগ হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজারের মতো।
কিন্তু জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর এই চিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন ৮ হাজারেরও কম যানবাহন চলাচল করছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
ভাড়া বেড়ে ব্যবসায়ীদের বিপাকে

যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ভাড়াও দ্রুত বেড়েছে। আগে যে ভাড়ায় ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান সহজেই পাওয়া যেত, এখন সেই ভাড়ায় গাড়ি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রাকের ভাড়া যেখানে আগে ২৪-২৫ হাজার টাকার মধ্যে ছিল, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩-৩৫ হাজার টাকায়। একইভাবে কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ২৮-৩০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪২-৪৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কন্টেইনারবাহী লরির ভাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটে চালকদের দুর্ভোগ
পরিবহন চালকদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জ্বালানি সংগ্রহ করা। আগে একবারে পর্যাপ্ত তেল নিয়ে যাত্রা শুরু করা গেলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে, ফলে বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
এই কারণে যাত্রার সময়ও বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। যেখানে আগে ১০-১২ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে পৌঁছানো যেত, এখন সেখানে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। পথে অতিরিক্ত খরচ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চালক ও মালিক উভয়ই চাপে পড়েছেন।
সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার শঙ্কা
খাতুনগঞ্জসহ দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এখান থেকে সারা দেশে পণ্য সরবরাহ করা হয়। পরিবহন সংকটের কারণে এই সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। যদিও বর্তমানে ক্রেতার চাপ কম থাকায় তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না, তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
বন্দর কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দরের অধিকাংশ পণ্যই সড়কপথে পরিবহন করা হয়। ফলে যানবাহন কমে যাওয়ায় বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন যানবাহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই চাপ আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে কিছু অসাধু চক্র এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















