ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যখন নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাপ বাড়ার কথা, ঠিক তখনই জ্বালানি সংকটে দেশের নৌপরিবহন খাত কার্যত বিপর্যস্ত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি হওয়া তেলের ঘাটতিতে অধিকাংশ নৌযান বসে আছে, আর যেগুলো চলছে সেগুলোকে চালাতে হচ্ছে পালা করে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, ঈদের সময় জ্বালানির চাহিদা আরও বাড়লে এই সংকট তীব্র আকার নিতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্য সরবরাহ ও যাত্রীসেবায়।
তেলের অভাবে থমকে নৌযান
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইরানে হামলার পর থেকেই ডিজেলের সরবরাহ দ্রুত কমে যায়। ডিপোগুলো থেকে প্রয়োজনের অর্ধেকেরও কম জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচল অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
এরই মধ্যে সারাদেশে প্রায় ৪০টি লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, আরও অনেক বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকার সদরঘাটসহ বিভিন্ন টার্মিনালে লঞ্চ চলাচল চালু রাখতে রোটেশন পদ্ধতি চালু করতে হয়েছে।

বন্দর কার্যক্রমে বড় ধাক্কা
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রতিদিন যেখানে লাখ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন, সেখানে মিলছে তার অল্প অংশ। লাইটার জাহাজের ঘাটতির কারণে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে। ফলে বিদেশি জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যার ফলে প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে আমদানিকারক ও জাহাজ মালিকদের।
এই সংকটের কারণে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পণ্য সরবরাহে চাপ ও বাজারে প্রভাব
নৌপথে চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহন করা হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এই সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যাত্রীসেবায় ভোগান্তি
আগেই সড়কপথের উন্নয়নের কারণে নৌপথে যাত্রী কমে গিয়েছিল। এখন জ্বালানি সংকটে সেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ঈদের সময় ঘরমুখো যাত্রীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি। অনেক রুটে ট্রিপ কমানো হয়েছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে লঞ্চ চলাচল।

টিকে থাকার লড়াইয়ে মালিকরা
লঞ্চ মালিকরা বলছেন, প্রতিদিন কয়েক লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও তারা পাচ্ছেন তার অর্ধেকেরও কম। কেউ কেউ খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনে লোকসান দিয়ে সেবা চালু রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এভাবে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
তাদের আশঙ্কা, সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
সামনে আরও সংকটের আশঙ্কা
আগামী ঈদুল আজহার সময় জ্বালানির চাহিদা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। তখন সংকট আরও তীব্র আকার নিতে পারে। ইতোমধ্যে আগাম সতর্কতা হিসেবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সমাধান কোথায়?
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট দ্রুত কাটবে না—এটাই সংশ্লিষ্টদের অভিমত। নৌপরিবহন খাত দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















