যেখানে অন্য যাত্রী বলে কিছু নেই
লা প্রেমিয়েরের পুরো অভিজ্ঞতাটাই গড়ে উঠেছে একটি মূল ধারণার ওপর — অন্য মানুষদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকা। টার্মিনালে ভিড় নেই, লাউঞ্জে অপেক্ষা নেই, পাসপোর্ট লাইনে দাঁড়ানো নেই। পাসপোর্টের কাজ আড়ালে সেরে নেওয়া হয়, যাত্রী তখন পোর্শেতে বসে আরাম করেন। বিমানে ওঠার পরেও সামনের তিনজন যাত্রী পেছনের তিনশোরও বেশি যাত্রী থেকে একটি পর্দায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
বিখ্যাত শেফ আলাঁ দুকাসের রান্না করা তিন কোর্সের খাবার, কাশ্মীরি কম্বল মোড়ানো বিছানা, উচ্চমানের চাদর — সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা যেন কোনো পাঁচতারা হোটেলকেও হার মানায়। বিমানের পাইলট নিজে কেবলমাত্র প্রথম শ্রেণির তিনজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বের হয়ে আসেন।
বিলাসিতার নতুন সংজ্ঞা: একাকীত্বই এখন বিলাসিতা
এয়ার ফ্রান্সের গ্রাহক অভিজ্ঞতা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ঘনিষ্ঠতা ও গোপনীয়তার অনুভূতি লা প্রেমিয়েরের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। বিমানবন্দরের পুরো যাত্রাটা যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত হয়, সেটাই তাদের লক্ষ্য।
করোনা মহামারির পর থেকে ধনীদের ভ্রমণ অভ্যাসে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে নিরিবিলি মানে ছিল ব্যক্তিগত দ্বীপ বা ভাড়া করা নৌকা। এখন সেই চাহিদা আরও বেড়েছে। বিলাসবহুল জীবনযাপন সংস্থা নাইটসব্রিজ সার্কেলের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের সদস্যরা এখন স্পা-র একটি রুম বুক করেন না — পুরো স্পাটাই নিজেদের জন্য আলাদা করে নেন। পাশে অন্য কেউ থাকুক, এটা তারা আর চান না।

‘ঘর্ষণমুক্ত’ ভ্রমণের স্বপ্ন
ভ্রমণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিচ্ছিন্নতার চাহিদা কেবল অহংকার থেকে নয়। এর পেছনে রয়েছে ভ্রমণের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দীর্ঘ লাইন, ব্যাগ বহনের ঝক্কি, অপেক্ষার যন্ত্রণা — এ সবকিছু থেকে নিস্তার পেতেই অতি ধনীরা লাখো টাকা ঢালছেন। ব্যক্তিগত প্রবেশপথ, কক্ষেই চেক-ইন, নিজস্ব রাঁধুনি — এগুলো মূলত ভ্রমণকে ঝামেলামুক্ত করার হাতিয়ার।
হাওয়াইয়ের ফোর সিজনস রিসোর্টে সাধারণ রুমের চেয়ে হাজার ডলার বেশি দিলে ‘হোটেলের ভেতরে আরেকটি হোটেল’-এর সুবিধা মেলে, যেখানে সাধারণ অতিথিরা প্রবেশ করতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যে নতুন একটি বেসরকারি স্কি ক্লাব খুলেছে, যেখানে স্কি সরঞ্জাম আগে থেকে গরম করে রাখা হয় এবং ইউরোপীয় প্রশিক্ষিত সোমেলিয়ে ব্যক্তিগত বাসস্থানে ওয়াইন পরিবেশন করেন।
একদিনের রাজকন্যা, তারপর বাস্তবে ফেরা
এই সার্ভিসে একবার ভ্রমণ করলে আর সাধারণ বিমানে চড়তে মন চায় না — এই সতর্কবার্তা আগেই শুনেছিলেন লেখক। একমুখী টিকিটের দাম প্রায় নয় লাখ টাকারও বেশি, আর দুই দিকেই প্রথম শ্রেণিতে গেলে খরচ ছাড়িয়ে যায় চোদ্দ লাখ টাকা।
তবে এত বিলাসিতার মাঝেও একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে — দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচা ভালো, নাকি পৃথিবীর সঙ্গে মিলেমিশে থাকা? বিলাসিতা উপভোগ করা এক কথা, আর এই ভ্রান্ত বিশ্বাসে ডুবে যাওয়া যে সমাজের সাধারণ নিয়ম আপনার জন্য প্রযোজ্য নয় — সেটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নিউ ইয়র্কে ফিরে সারি সারি সাধারণ ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তিই লেগেছিল।
এয়ার ফ্রান্সের লা প্রেমিয়েরে উড়লে মিলবে মার্সিডিজ, পোর্শে আর শেফের রান্না — তবে টিকিটের দাম শুনলে চোখ কপালে উঠবে!
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















