ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করেছে। বাইরে থেকে তেলের দাম যতটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, বাস্তবে পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি সংকটপূর্ণ। বাজারের দুই ধরনের দামের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান এখন বিশ্লেষকদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।
দাম এক, বাস্তবতা আরেক
সাধারণভাবে মানুষ যে তেলের দাম দেখে, তা মূলত ভবিষ্যৎ বাজারের হিসাব। এই দাম দেখলে মনে হতে পারে, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। উদাহরণ হিসেবে, ইউরোপীয় বাজারে ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৯ ডলার, যা আগের বড় সংকটের সময়ের তুলনায় কম।

কিন্তু বাস্তবে, যদি এখনই তেল কিনে সরাসরি সরবরাহ নিতে হয়, তাহলে খরচ অনেক বেশি। সরাসরি সরবরাহ বা স্পট বাজারে সেই দাম প্রায় ১৪৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বিশাল ব্যবধানই ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাজারের প্রকৃত চিত্র অনেক বেশি চাপের।
ফিউচার ও স্পট বাজারের বিভ্রান্তি
তেলের বাজারে সাধারণত দুই ধরনের দাম থাকে—একটি ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত, আরেকটি তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য। এই দুই দামের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ বাজার এখন বাস্তব পরিস্থিতিকে ঠিকভাবে প্রতিফলিত করছে না। ফলে বাজার বিশ্লেষণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরবরাহে বড় ধাক্কা
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ বা তার বেশি অংশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে তেলবাহী জাহাজ চলাচল এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
এই কারণে বিপুল পরিমাণ তেল পারস্য উপসাগরেই আটকে আছে। জাহাজ কোম্পানিগুলো এখনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না, ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে। এশিয়ার অনেক দেশ, যারা পারস্য উপসাগরের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা সরাসরি সংকটে পড়েছে।
ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে পেট্রল স্টেশনগুলোতে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কা সপ্তাহে একদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে, যাতে জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়। অনেক দেশ দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ বা পরামর্শ দিচ্ছে।

যুদ্ধবিরতিতেও স্বস্তি নেই
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। জাহাজ চলাচল এখনো ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় সরবরাহ সংকট অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পট বাজারের দামই প্রকৃত সংকটের চিত্র তুলে ধরছে। এটি দেখাচ্ছে, বাজার কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে।
অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষকদের জন্যও এক ধরনের ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। গত দুই দশকের মধ্যে এমন বড় ব্যবধান আগে দেখা যায়নি। ফলে ভবিষ্যতে তেলের বাজার কোন দিকে যাবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















