গত দুই সপ্তাহে সরকার যোগাযোগ ও ডিজিটাল মন্ত্রণালয়ের ৯/২০২৬ নম্বর বিধিমালার বাস্তবায়ন তদারকি শুরু করেছে। এই নীতিমালার লক্ষ্য শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করা হলেও, এর কার্যকারিতা এবং শিশুদের তথ্যপ্রাপ্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিশু সুরক্ষা আইন ও নতুন বিধিমালা
এই বিধিমালা মূলত ২০২৫ সালের ১৭ নম্বর সরকারি নিয়মের (পিপি তুনাস) একটি কারিগরি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করছে। এর অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত হলো ১৬ বছরের নিচে শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। এর উদ্দেশ্য হলো অনলাইন ঝুঁকি—যেমন প্রলোভন, নির্যাতন ও ক্ষতিকর কনটেন্ট—থেকে শিশুদের রক্ষা করা।
যোগাযোগ ও ডিজিটাল মন্ত্রী মেউতিয়া হাফিদ এই পরিস্থিতিকে “ডিজিটাল জরুরি অবস্থা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বর্তমানে প্রায় ৭ কোটি ইন্দোনেশীয় শিশু সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়।

বিশ্বব্যাপী প্রবণতার সঙ্গে মিল
এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের একটি বাড়তে থাকা প্রবণতার অংশ। অস্ট্রেলিয়া ২০২৪ সালে আইন পাস করে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। একই ধরনের বিধিনিষেধ ভারতের কর্ণাটক রাজ্য ও ব্রাজিলেও চালু হয়েছে। ব্রাজিলে ১৬ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট অভিভাবকের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয় এবং অসীম স্ক্রলিংয়ের মতো আসক্তিমূলক ফিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ও স্পেনেও এ ধরনের নীতিমালা বিবেচনাধীন।
নীতির বাস্তবায়ন ও প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতিক্রিয়া
ইন্দোনেশিয়ায় এই নীতি ২৮ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলোকে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে নিজেদের মূল্যায়ন ও ঝুঁকির শ্রেণিবিন্যাসের জন্য। প্রথম পর্যায়ে ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস, টিকটক, এক্স, রোব্লক্স ও বিগো লাইভকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
কিছু প্ল্যাটফর্ম দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। বিগো লাইভ ও এক্স বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করে এবং ১৬ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে রোব্লক্স ও টিকটক আংশিকভাবে নিয়ম মেনে চলছে। রোব্লক্স ১৩ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের জন্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে এবং টিকটক ধাপে ধাপে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করছে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আপত্তি
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই নীতির প্রতি অনীহা দেখিয়েছে। মেটা ও গুগলকে দুইবার মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ৬-৭ এপ্রিল তারা ব্যাখ্যা দিতে উপস্থিত হয়।
মেটার মতে, শিশুদের কোন অ্যাপ ব্যবহার করবে তা অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। তারা সতর্ক করেছে, কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিশুদের অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মে ঠেলে দিতে পারে। গুগলও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা শিশুদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে, কারণ তারা অ্যাকাউন্ট ছাড়া কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারে, যা অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে।

ডিজিটাল সাক্ষরতার চ্যালেঞ্জ
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব সমস্যা—ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি। জাতীয় সূচক অনুযায়ী, দেশে ডিজিটাল দক্ষতা এখনো মাঝারি পর্যায়ে। ফলে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন না।
গেমিং খাতেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। স্টিম প্ল্যাটফর্মে সম্প্রতি বয়সভিত্তিক রেটিং চালু করা হয়েছে, যা ব্রাজিল ও জার্মানির মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বাস্তবায়নে অসঙ্গতি রয়েছে—কিছু নিরীহ গেম ১৮+ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, আবার প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট শিশুদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্দোনেশিয়ার নির্বাহী পরিচালক উসমান হামিদ বলেছেন, এই নীতিমালা লাখো তরুণের যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি ও সৃজনশীল প্রকাশের অধিকার হরণ করতে পারে।
সামঞ্জস্য খোঁজার চ্যালেঞ্জ
সর্বোপরি, ইন্দোনেশিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এই নীতি প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যর্থতা তুলে ধরলেও, একা এটি কার্যকর হতে পারবে না। কর্পোরেট দায়বদ্ধতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এই নিয়ম হয় অকার্যকর হবে, নয়তো সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
নীতির সাফল্য নির্ভর করবে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিরাপত্তা ও ডিজিটাল প্রজন্মের মৌলিক অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারে তার ওপর।

যা জানা গেছে
যোগাযোগ ও ডিজিটাল মন্ত্রণালয় মেটা ও গুগলকে তলব করেছে পিপি তুনাস মানা হচ্ছে কি না তা যাচাই করতে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক বয়সসীমা কার্যকর করেনি।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মেটা ও গুগলকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন আইনে এসব প্ল্যাটফর্মে অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ সীমিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২৮ মার্চ আইন কার্যকর হওয়ার সময় তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, “এই নিয়ম বাস্তবায়নে সরকার কোনো আপস করবে না।”
শুরু থেকেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই নীতির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মতে, কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিশুদের শেখা ও ডিজিটাল পরিবেশে চলার ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। তারা দাবি করেছে, বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাই যথেষ্ট।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত বছর থেকেই এ বিষয়ে আলোচনা চলছিল এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। চলতি বছরে উপমন্ত্রী নেজার পাত্রিয়ার উপস্থিতিতে ডেভেলপারদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল।
তবুও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও প্ল্যাটফর্মগুলো কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করেছে, “উচ্চ ঝুঁকি” শ্রেণিবিন্যাসের কারণে বর্তমান আইনে এসব প্ল্যাটফর্ম শিশুদের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
তেঙ্গারা স্ট্র্যাটেজিকস 



















