তেলের বাজারে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, যা এখনো যথেষ্ট আলোচনায় আসেনি। হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ সংকট তীব্র হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে তেলের দাম অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দাম কিছুটা ১০০ ডলারের ওপরে উঠে আবার কমে যাচ্ছে। কখনো খবরের শিরোনামের সঙ্গে ওঠানামা করছে, তবে সামগ্রিকভাবে একটি রহস্য তৈরি হয়েছে—কেন তেলের দাম এত বড় লাফ দিচ্ছে না, যখন বিভিন্ন দেশ তাদের কৌশলগত তেল মজুত থেকে সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছে, যা স্পষ্টতই ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
তেল বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি ব্যাখ্যা ঘুরে বেড়াচ্ছে—‘কাগুজে তেল’। এই ধারণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ভবিষ্যৎ বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রি করে কৃত্রিমভাবে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে বর্তমান সময়ে দাম কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তেলের দাম বাড়া ঠেকাতে ভবিষ্যৎ বাজারে পদক্ষেপ নিতে পারে। তখন ব্রেন্ট তেলের দাম বেড়ে ৮৫ ডলারে পৌঁছেছিল এবং তার কয়েক দিন আগে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
তেলের বাজার কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি। প্রথমত, তেলের বাজারে একক কোনো দাম নেই। ব্রেন্ট, দুবাই লাইট বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—এগুলো ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মানদণ্ডমূলক দাম। এরপর আছে পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানির মতো পণ্যের আলাদা দাম। এছাড়া ন্যাফথা বা তরল গ্যাসের মতো অন্যান্য পণ্যও রয়েছে। আর আছে ভবিষ্যৎ বাজার, যেখানে আজ চুক্তি করে ভবিষ্যতে তেল সরবরাহ নেওয়া যায়।
সাধারণ অবস্থায় এসব দামের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। কাঁচা তেলের দাম বাড়লে পেট্রোল-ডিজেলের দামও বাড়ে। ভবিষ্যৎ বাজারের দাম একটি সীমা তৈরি করে, যার ওপরে বর্তমান দাম খুব বেশি যেতে পারে না।

এখন প্রশ্ন উঠছে—তেলের বাজারে কি সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে?
প্রকাশিত প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ছিল, যুদ্ধ চলাকালে স্বল্পমেয়াদে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ বাজারে কম দামে বিপুল তেল বিক্রি করতে পারে। চুক্তির মেয়াদ শেষে তারা ধারণা করেছিল, যুদ্ধের ফলাফল স্পষ্ট হবে এবং দাম স্থিতিশীল বা কমে আসবে। এর মাধ্যমে বাজারকে কিছুটা স্থির রেখে সময় কেনা সম্ভব।
কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কিছু এগোয়নি। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধই থেকেছে। তেলের বাজারে বিপর্যয় এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ও ইরানের তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং কৌশলগত মজুত থেকেও তেল ছাড়ে। তবে এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট ছিল না।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, পরিস্থিতি ততই জটিল হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ তেলবাহী জাহাজগুলো গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘কাগুজে তেল’ তত্ত্ব সামনে আসে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এমন তেল বিক্রি করছে যা বাস্তবে তাদের কাছে নেই, অন্তত সেই দামে নেই যেভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সফল করতে হলে বিষয়টি গোপন রাখা জরুরি, কারণ বাজারে হস্তক্ষেপের খবর ছড়িয়ে পড়লে তা কার্যকর হয় না। তবে এর প্রভাব দেখে বোঝা যায় কিছু অস্বাভাবিক ঘটছে।

এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো ‘বিচ্ছিন্নতা’—যেখানে তেলের বিভিন্ন দামের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক ভেঙে যায়। ইতোমধ্যে জেট জ্বালানি ও ডিজেলের দাম অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচ্ছিন্নতা দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যৎ বাজার ও বাস্তব বাজারের মধ্যে। সাধারণত এদের দামের পার্থক্য খুব কম থাকে। কিন্তু এখন তা বেড়ে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৪০ ডলারে পৌঁছেছে। এই ব্যবধান বাড়তে শুরু করে মার্চের শেষ দিকে, যখন তেলের বাজার স্থিতিশীল করার আগের পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে শিকাগোর বাণিজ্যিক বিনিময় প্রতিষ্ঠানের প্রধান টেরি ডাফি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের হস্তক্ষেপ “ভয়াবহ বিপর্যয়” ডেকে আনতে পারে। আরেকটি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের গ্রাহকেরা জানতে চেয়েছেন সাম্প্রতিক বড় লেনদেনগুলো কি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে হয়েছে।
বাজারে হস্তক্ষেপের কোনো সরাসরি প্রমাণ সাধারণত থাকে না, কারণ থাকলে তা কার্যকর হতো না। তবে এর প্রভাবই আসল ইঙ্গিত দেয়। আর সাম্প্রতিক তেলের বাজারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, ‘কাগুজে তেল’ কার্যক্রম এখন পুরোদমে চলছে।
খুররম হুসেইন 


















