টিকা মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্ভাবন। গুটি বসন্ত নির্মূল, পোলিও প্রায় নির্মূল এবং শিশু মৃত্যুহার কমাতে টিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু একই সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য বলছে—টিকা নেওয়ার পর গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিরল হলেও বাস্তব। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ভারতে একটি সুসংগঠিত টিকা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
সমষ্টিগত সুরক্ষা, ব্যক্তিগত ঝুঁকি
টিকাকরণ আসলে একটি সামাজিক চুক্তি। একজন ব্যক্তি ছোট একটি ঝুঁকি নেন, যাতে পুরো সমাজ বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়। বিশেষ করে কোভিড সময়ে ভারতের কোটি কোটি মানুষ সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়ে টিকা নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে এটি ছিল প্রায় বাধ্যতামূলকও। কিন্তু যারা টিকা নেওয়ার পর গুরুতর ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে—এই প্রশ্ন দীর্ঘদিন অমীমাংসিত ছিল।
সাম্প্রতিক এক মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, কোভিড টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি ‘দোষ প্রমাণের প্রয়োজন নেই’—এমন ক্ষতিপূরণ নীতি তৈরি করতে। এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
বিরল হলেও বাস্তব ঝুঁকি
চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রমাণিত—টিকা নেওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে অ্যানাফাইল্যাক্সিস, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, পক্ষাঘাত বা মস্তিষ্কজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদিও এসব ঘটনা খুবই কম, কিন্তু একেবারে অস্বীকার করার মতো নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টিকা নেওয়ার পর হাজার হাজার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুও রয়েছে।
এই বিরল ঘটনাগুলোর কারণেই ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা নৈতিকভাবে জরুরি হয়ে ওঠে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আসলে সমাজের স্বার্থে ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

সংবিধান ও রাষ্ট্রের দায়
সংবিধান অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যা জীবনের অধিকারের অংশ। তাই রাষ্ট্র যদি টিকাকরণকে উৎসাহিত বা বাধ্যতামূলক করে, তাহলে এর ফলে হওয়া ক্ষতির দায়ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
এখানে ‘যৌক্তিক প্রত্যাশা’ নীতিও প্রযোজ্য—নাগরিকরা যখন রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলেন, তখন তারা আশা করেন যে বিপদের সময় রাষ্ট্র তাদের পাশে থাকবে।
বর্তমান আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে টিকা সংক্রান্ত ক্ষতির জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়া কঠিন।
দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ পেতে হলে প্রমাণ করতে হয় কারও ভুল বা অবহেলা ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটে ব্যক্তিগত শারীরিক প্রতিক্রিয়ার কারণে, যেখানে কারও দোষ প্রমাণ করা যায় না।
ভোক্তা অধিকার আইনেও জটিলতা রয়েছে, বিশেষ করে যখন টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। আবার জনস্বার্থ মামলাও ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণের কার্যকর সমাধান দিতে পারে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে টিকা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশেষ আদালতের মাধ্যমে সহজ প্রমাণের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যে গুরুতর ক্ষতির ক্ষেত্রে এককালীন অর্থ প্রদান করা হয়। জাপান, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।
তাই ভারত চাইলে এসব মডেল অনুসরণ করতে পারে।
)
ভারতের জন্য প্রস্তাবিত কাঠামো
ভারতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন জরুরি, যা সংসদের মাধ্যমে পাস হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেবে।
এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট তালিকা থাকতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট রোগ দেখা দিলে তা টিকার কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।
এছাড়া একটি স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা দরকার, যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই আবেদন করতে পারবেন।
ক্ষতিপূরণের জন্য একটি তহবিল গঠন করতে হবে, যেখানে সরকার ও টিকা প্রস্তুতকারক উভয়ই অবদান রাখবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ—যাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে আসে।
বিশ্বাস গড়ে তোলার প্রশ্ন
অনেকে মনে করেন, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করলে টিকা নেওয়ার আগ্রহ কমতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এর উল্টোটা সত্য।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মানুষের আস্থা বাড়ায়। মানুষ জানে, ক্ষতি হলে তারা একা পড়ে থাকবে না।
শেষ কথা
টিকাকরণ একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে ব্যক্তি সমাজের জন্য ঝুঁকি নেন। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো।
এখন ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—শুধু নির্দেশ পালন নয়, বরং একটি কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















