পুরুষদের অনেকেই এখনও মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না, নিজেরাই সামলানোর চেষ্টা করেন—ফলে বাড়ছে ঝুঁকি।
শৈশব থেকেই সমাজ ছেলেদের শেখায়, কষ্ট চেপে রাখতে হবে, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ। এই ধারণাই বড় হয়ে অনেক পুরুষকে মানসিক সমস্যার কথা স্বীকার করতে বাধা দেয়। ফলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা চাপ থাকলেও তারা চিকিৎসা নিতে চান না বা মাঝপথে চিকিৎসা ছেড়ে দেন।
কেন পুরুষরা সাহায্য চান না
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পুরুষ মনে করেন সাহায্য চাওয়া মানে ব্যর্থতা। তাই তারা সমস্যাকে এড়িয়ে যান বা একা মোকাবিলা করতে চান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে একজন গত বছরে কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন।
তবু নারীদের তুলনায় পুরুষরা কম চিকিৎসা নেন, সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে এবং চিকিৎসা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও বেশি। একই সঙ্গে মাদক বা অ্যালকোহলের অপব্যবহার এবং আত্মহত্যার হারও পুরুষদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিষণ্নতার ভিন্ন লক্ষণ
পুরুষদের বিষণ্নতা অনেক সময় সহজে ধরা পড়ে না। কারণ তাদের ক্ষেত্রে ক্লান্তি বা আগ্রহ হারানোর পাশাপাশি রাগ, বিরক্তি, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কিংবা শারীরিক সমস্যা যেমন মাথাব্যথা বা পেটব্যথা দেখা যায়।
এই ধরনের লক্ষণকে অনেক সময় “গোপন বিষণ্নতা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে অনেক পুরুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা আসলে বিষণ্নতায় ভুগছেন।
নতুন বাবাদের অদেখা চাপ
শুধু মায়েদের নয়, নতুন বাবারাও মানসিক চাপে পড়েন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ শতাংশ নতুন বাবা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। নতুন দায়িত্ব, ঘুমের অভাব এবং জীবনের পরিবর্তন তাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
অনেক সময় তারা শুধু সঙ্গীকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবেন, নিজের যত্ন নিতে ভুলে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের ঘুম, খাবার, ব্যায়াম এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাও জরুরি।
সামাজিক সম্পর্কই বড় শক্তি
মানসিক সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সংযোগ। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

একই সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়ামও উপকারী, তবে অতিরিক্ত নয়। সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ দিন ব্যায়াম মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যায়াম উল্টো ক্ষতি করতে পারে।
সম্পর্কের সমস্যাও বড় কারণ
অনেক পুরুষ বুঝতে পারেন না যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বা নির্যাতন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সাতজন পুরুষের একজন জীবনে কখনও না কখনও সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হন।
লজ্জা ও একাকিত্বের কারণে তারা এসব বিষয় কাউকে বলতে চান না, যা সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে।
সাহায্য নেওয়া এখন বাড়ছে
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরুষদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি পুরুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটের সময় নয়, যেকোনো সময় থেরাপি নেওয়া যেতে পারে। নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে না বুঝলেও সাহায্য চাইতে কোনো সমস্যা নেই।
পরিবর্তনের সময় এখনই
সমাজের ধারণা বদলানো এবং পুরুষদের নিজেদের প্রতি যত্নবান হওয়া—এই দুইয়ের সমন্বয়েই মানসিক স্বাস্থ্য সংকট কমানো সম্ভব। নিজের অনুভূতি স্বীকার করা এবং প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়াই হতে পারে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং খোলামেলা আলোচনা শুরু করাই এখন সময়ের দাবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















