ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ জন আইন বিভাগের শিক্ষার্থীর জড়িত থাকা সাম্প্রতিক বুলিং ঘটনাটি সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে আক্রমণাত্মক আচরণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই ঘটনা দেশের নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে নৈতিকতা ও নাগরিক দায়বদ্ধতার অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্র, পরিবার ও তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সতর্কবার্তা—নৈতিকতা ও সততার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা জরুরি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের স্থায়ী উপস্থিতি জাতীয় শিক্ষার মানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চতুর্থ লক্ষ্য—নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহিংসতামুক্ত শিক্ষার পরিবেশ—এর সরাসরি বিরোধী। বুলিং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, শেখার আগ্রহ কমায় এবং শিক্ষাগত ফলাফলকে দুর্বল করে।
ইন্দোনেশিয়ায় বুলিংয়ের বর্তমান প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে ২৮৫টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৩টিতে—যা দ্বিগুণেরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ ঘটনাই বুলিং সম্পর্কিত। শারীরিক বুলিং সবচেয়ে বেশি (৫৫.৫ শতাংশ), এরপর রয়েছে মৌখিক ও মানসিক নির্যাতন (২৯.৩ শতাংশ)।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা (২৬ শতাংশ), এরপর রয়েছে মাধ্যমিক (২৫ শতাংশ) এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা (১৮.৭৫ শতাংশ)। এটি স্পষ্ট করে যে শৈশবই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।
সাম্প্রতিক সময়ে বুলিংয়ের বিস্তার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা সামনে আসছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ২০২৫-২০২৬ সময়কালে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
উদয়না বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে ঘিরে বুলিংয়ের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। শ্রীবিজয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে অশালীন যৌন বিষয়বস্তু নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া জাম্বির একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে বুলিংয়ের ঘটনা ভাইরাল হওয়ায় জনমত তীব্র হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ শিক্ষার্থীর সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা একটি গ্রুপ চ্যাটে সহপাঠী ও নারী শিক্ষকদের নিয়ে অশালীন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছে। তদন্ত চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে বুলিং একটি ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সমস্যা, যা এখন জাতীয় পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শারীরিক, মৌখিক, সাইবার ও যৌন—সব ধরনের সহিংসতা শিক্ষাক্ষেত্রে একত্রে উপস্থিত। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।
বুলিং শুধু উন্নয়নশীল দেশেই নয়, উন্নত দেশেও বড় সমস্যা। উদাহরণ হিসেবে কানাডায় স্কুল ও কর্মক্ষেত্র—উভয় ক্ষেত্রেই বুলিং দেখা যায়।

কানাডায় বুলিংকে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটি ব্যাপক নীতিমালা ও জাতীয় প্রচারণার মাধ্যমে বুলিং প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বুলিংকে শুধু শিশু বা কিশোরদের সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না, বরং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য।
কানাডিয়ান কর্মক্ষেত্র স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কেন্দ্র কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা তথ্য, নির্দেশিকা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রদান করে।
কানাডার একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো বুলিংয়ের স্পষ্ট আচরণগত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। এর মধ্যে রয়েছে গুজব ছড়ানো, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা, কারও কাজ নষ্ট করার চেষ্টা, অযৌক্তিক সময়সীমা বা অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়া, অপমানজনক ভাষা ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ।
এই ধরনের স্পষ্ট সংজ্ঞা মানুষকে বুলিং চিহ্নিত করতে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর আচরণকে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে বাধা দেয়।
বুলিং প্রতিরোধে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যালয়গুলোকে নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কঠোর নীতিমালা ও স্বচ্ছ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকবে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক ও প্রশাসকদের মধ্যস্থতার দক্ষতা বাড়াতে হবে। পরিবার, স্কুল ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সাইবার বুলিংয়ের কারণে ডিজিটাল শিক্ষা ও মিডিয়া নৈতিকতার ওপরও জোর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে গবেষণাভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
এই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল নীতির পরিবর্তে একটি রূপান্তরমূলক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব, যা নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং সমাজকে আরও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
লেখক: পদাং স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক; শিক্ষাবিষয়ক গবেষণায় পিএইচডি, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা। মতামত ব্যক্তিগত।
ফাউজানাহ ফাউজান এল মুহাম্মাদি 



















