ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি গ্রহণকারী অনেক রোগী স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগের ঘাটতি এবং মানসিক ঝাপসাভাবের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে সাধারণভাবে “কেমো ব্রেইন” বলা হয়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম কেমোথেরাপি চলাকালে এই ধরনের জ্ঞানীয় বা মানসিক সমস্যার কিছুটা হলেও প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ‘ক্যানসার’-এ প্রকাশিত দ্বিতীয় ধাপের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কেমো ব্রেইনের প্রভাব কতটা
গবেষকদের মতে, কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কোনো না কোনো মাত্রায় ক্যানসার-সম্পর্কিত জ্ঞানীয় দুর্বলতার শিকার হতে পারেন। এর মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, তথ্য মনে রাখতে অসুবিধা এবং একসঙ্গে একাধিক কাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গবেষকরা পরীক্ষা করেন, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বল্পমাত্রার আইবুপ্রোফেন অথবা এই দুইয়ের সমন্বয় মস্তিষ্কের কার্যকারিতা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে কি না।
গবেষণার ধরন
গবেষণায় অংশ নেন ৮৬ জন ক্যানসার রোগী, যারা কেমোথেরাপির সময় জ্ঞানীয় সমস্যার অভিযোগ করেছিলেন। অংশগ্রহণকারীদের ছয় সপ্তাহের জন্য চারটি দলে ভাগ করা হয়।
একটি দল ঘরে বসে করা যায় এমন ব্যায়ামের পাশাপাশি স্বল্পমাত্রার আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করে। দ্বিতীয় দল একই ধরনের ব্যায়ামের সঙ্গে প্লাসেবো পায়। তৃতীয় দল শুধুমাত্র আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করে এবং চতুর্থ দল শুধুই প্লাসেবো পায়।
‘এক্সারসাইজ ফর ক্যানসার পেশেন্টস’ বা এক্সক্যাপ নামে পরিচিত ব্যায়াম কর্মসূচিতে কম থেকে মাঝারি মাত্রার হাঁটা এবং রেজিস্ট্যান্স ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা রোগীরা ঘরে বসেই করতে পারতেন।
ব্যায়ামে মিলেছে ইতিবাচক ফল
ছয় সপ্তাহ পর গবেষকরা দেখতে পান, যারা আইবুপ্রোফেন ছাড়া শুধু ব্যায়াম কর্মসূচি অনুসরণ করেছিলেন, তারা মনোযোগ-সংক্রান্ত পরীক্ষায় প্লাসেবো গ্রহণকারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ফল করেছেন।
শুধু আইবুপ্রোফেন গ্রহণকারীদের মধ্যেও কিছু উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে সেই উন্নতি ব্যায়ামের তুলনায় কম স্থিতিশীল ও কম স্পষ্ট ছিল।
এছাড়া গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যায়ামকারী রোগীদের ক্ষেত্রে পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের নজরে আসা জ্ঞানীয় সমস্যার হারও তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
আইবুপ্রোফেন নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন
গবেষণায় আইবুপ্রোফেনের ফলাফল পুরোপুরি একরকম ছিল না। যারা ওষুধটি গ্রহণ করেছিলেন, তাদের স্বল্পমেয়াদি মৌখিক স্মৃতিশক্তির উন্নতি অন্যদের তুলনায় কম দেখা গেছে। ফলে আইবুপ্রোফেনের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে গবেষকরা মনে করছেন।
প্রধান গবেষক মিশেল সি. জ্যানেলসিনস বলেন, এই ফলাফল আশাব্যঞ্জক। কারণ ব্যায়াম কেবল মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতেই নয়, ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের জন্য আরও নানা স্বাস্থ্যগত সুবিধা এনে দেয়।
তিনি জানান, কেমোথেরাপিজনিত জ্ঞানীয় দুর্বলতার ওপর ব্যায়াম এবং প্রদাহনাশক ওষুধের প্রভাব মূল্যায়নে এটি প্রথম দিকের বিশেষায়িত গবেষণাগুলোর একটি, যেখানে জ্ঞানীয় পরীক্ষা এবং রোগীদের অভিজ্ঞতা—দুই ধরনের তথ্যই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরের তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন। পাশাপাশি কোন ধরনের ব্যায়াম এবং কী মাত্রার আইবুপ্রোফেন সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, সেটিও আরও বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
তারা পরামর্শ দিয়েছেন, ক্যানসারের চিকিৎসাকালে মানসিক বা জ্ঞানীয় সমস্যায় ভুগলে নতুন কোনো ব্যায়াম কর্মসূচি বা ওষুধ শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
#ক্যানসার #কেমোথেরাপি #কেমোব্রেইন #ব্যায়াম #স্বাস্থ্যগবেষণা #মানসিকস্বাস্থ্য #চিকিৎসাবিজ্ঞান #স্বাস্থ্যসংবাদ #সারাক্ষণরিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















