দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নেপালের অবস্থান বরাবরই এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে গড়ে উঠেছে। একদিকে ভারত ও চীনের মতো দুই বৃহৎ শক্তির মাঝখানে তার ভৌগোলিক অবস্থান, অন্যদিকে নিজস্ব সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজন—এই দুইয়ের সমন্বয় করেই কাঠমান্ডুকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এর সবচেয়ে পরিচিত প্রকাশ ছিল ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’। কিন্তু ভারত-চীন সম্পর্ক যত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে, নেপালের জন্য সেই ভারসাম্য ধরে রাখার কাজও তত কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি বেইজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসের একটি আয়োজনকে ঘিরে যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে, তা ভারত-চীন সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তির একটি দিক তুলে ধরে। কয়েক বছর পর ২ আগস্ট ভারতীয় দূতাবাস সেখানে ‘ওপেন হাউস’ আয়োজন করে। ভারতীয় প্রবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় চীনে বসবাসরত ভারতীয়রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিরোধী মনোভাব, চীনে ভারতীয়দের জন্য কাজের ভিসার সীমাবদ্ধতা এবং প্রবাসী ভারতীয়দের স্বামী-স্ত্রীর কর্মসংস্থান ও কনস্যুলার সুবিধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু ভারতীয় প্রবাসীদের সমস্যার কারণে নয়। এর গভীরে রয়েছে দুই দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক অনাস্থা। চীন ও ভারতের মধ্যে এখনো সরাসরি বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনা তাৎক্ষণিকভাবে দেখা না গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক আরও প্রতিযোগিতামূলক ও কঠিন হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে। আর এই পরিবর্তন নেপালের জন্য নিছক প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি তার নিজস্ব কূটনৈতিক কৌশলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারসাম্য থেকে সক্রিয় ভূমিকার পথে
ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েন বাড়লে নেপালের সামনে মূল প্রশ্ন হবে—সে কি কেবল দুই শক্তির মাঝখানে অবস্থিত একটি ‘বাফার’ রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে, নাকি নিজের ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেবে?
দ্বিতীয় পথটি নেপালের জন্য বেশি আকর্ষণীয়। একটি ভূরাজনৈতিক ‘পিভট’ রাষ্ট্র কেবল বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রভাব সহ্য করে না; বরং নিজের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সম্পর্কের কাঠামোকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তার নিজস্ব কূটনৈতিক এজেন্ডা থাকে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করার সক্ষমতা থাকে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজের জন্য সুযোগে রূপ দেওয়ার কৌশল থাকে।
নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বড় সম্পদ। ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী অবস্থান তাকে যোগাযোগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাব্য সেতুতে পরিণত করতে পারে। কিন্তু ভৌগোলিক সুবিধা নিজে থেকেই ভূরাজনৈতিক ক্ষমতায় পরিণত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ধারাবাহিকতা।
এখানেই নেপালের সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্ট।

‘বাফার’ থেকে ‘ব্যালান্সার’ হওয়া সম্ভব
নেপালের পক্ষে আগামী বছরগুলোতে তার পুরোনো ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে আরও সক্রিয় ‘ব্যালান্সার’ বা আঞ্চলিক সেতু হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব। ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল নির্ভরতার ভিত্তিতে না দেখে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সাজাতে পারলে কাঠমান্ডু নিজের কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে পারে।
এ ধরনের নীতি মানে ভারতকে দূরে সরিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া নয়, আবার চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করাও নয়। বরং উভয় দেশের সঙ্গে পৃথক স্বার্থ ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী সম্পর্ক পরিচালনা করা। নেপালের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে এমন একটি অবস্থান তৈরি করা, যেখানে দুই প্রতিবেশীর প্রতিযোগিতা তার জন্য সংকটের বদলে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করবে।
তবে এখানেই একটি মৌলিক সীমারেখা রয়েছে। সক্রিয় ভারসাম্য রক্ষাকারী রাষ্ট্র হওয়া আর প্রকৃত অর্থে একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।
নেপালের কাঠামোগত সীমা
একটি দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু তার মানচিত্রের অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ—সবকিছু মিলেই একটি রাষ্ট্রের কৌশলগত ওজন তৈরি হয়। নেপালের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলোর মধ্যে বেশ কিছু এখনো সীমিত।
ফলে নেপাল চাইলেই ভারত ও চীনের সমপর্যায়ের প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না। তার সামনে একটি কাঠামোগত সীমা রয়েছে। এই সীমা অতিক্রম করা সহজ নয়, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নেপালের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
তবু এর অর্থ এই নয় যে নেপালের কোনো কৌশলগত বিকল্প নেই। বরং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করা। একটি ছোট রাষ্ট্রও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যদি সে নিজের ভূগোলকে কার্যকর নীতি, অর্থনৈতিক সংযোগ ও বহুমুখী কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতার
ভারত-চীন সম্পর্কের অবনতি নেপালের জন্য একই সঙ্গে ঝুঁকি ও সুযোগ তৈরি করছে। ঝুঁকি হলো, দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে নেপালের ওপরও পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে। সুযোগ হলো, নেপাল যদি নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তার কৌশলগত গুরুত্বও বাড়বে।
সুতরাং নেপালের সামনে বাস্তবসম্মত পথ হলো ‘প্যাসিভ বাফার’ থেকে ‘অ্যাকটিভ ব্যালান্সার’ এবং সেখান থেকে আঞ্চলিক সেতুতে পরিণত হওয়ার চেষ্টা। সম্পূর্ণ অর্থে একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক ‘পিভট’ রাষ্ট্র হওয়া হয়তো তার সামর্থ্যের বাইরে; কিন্তু ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের জায়গা তৈরি করা নেপালের জন্য সম্ভব।
এই রূপান্তর শেষ পর্যন্ত ভূগোলের চেয়ে বেশি নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সক্ষমতার ওপর। নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য তাই ইতিহাসের প্রশ্নটি সরল—দুই শক্তির মাঝখানে অবস্থান করাই কি তার নিয়তি, নাকি সেই অবস্থানকেই কাজে লাগিয়ে সে নিজের জন্য একটি স্বাধীন আঞ্চলিক ভূমিকা নির্মাণ করতে পারবে?
এই সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নেপালের ভূরাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করবে।
নির্মল পি. আচার্য 


















