চীনে বিবাহ ও পরিবার ধরে রাখার জন্য সরকারের নানা প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও, ক্রমশ বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা। বিশেষ করে নারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজেদের অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং মানসিকতার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এই প্রবণতা নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করছে।
দাম্পত্যে অসন্তোষ, বিচ্ছেদের দিকে ঝোঁক
চীনের সাম্প্রতিক সামাজিক প্রবণতা দেখায়, বিবাহিত জীবনের মান নিয়ে অসন্তোষ এখন বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ। আগে যেখানে স্বামীর সহিংসতা, পরকীয়া বা জুয়ার মতো বড় সমস্যা সামনে আসত, এখন সেখানে মূল্যবোধের অমিল ও সম্পর্কের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নারীরা আর কেবল সহ্য করার পথ বেছে নিচ্ছেন না; বরং নিজেদের সুখ ও সম্মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বনাম ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত
জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং জন্মহার হ্রাস পাওয়ায় সরকার বিবাহ টিকিয়ে রাখতে নানা নিয়ম চালু করেছে। যেমন, বিবাহ বিচ্ছেদের আগে ৩০ দিনের অপেক্ষাকাল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছেদের সংখ্যা কমলেও, পরে আবার তা বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
আইনি বাধা ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া
বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে আদালতের প্রক্রিয়াও সহজ নয়। অনেক সময় ‘পারস্পরিক ভালোবাসার ভাঙন’ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি নির্যাতনের প্রমাণ থাকলেও তা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয় না। ফলে প্রথম শুনানিতেই বিচ্ছেদ অনুমোদনের হার কম। অনেক ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নারীদের অবস্থান
বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মও নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামীর পরিবার বাড়ির খরচ বহন করায়, বিচ্ছেদের পর সেই সম্পত্তি পুরুষের কাছেই থেকে যায়। তবুও, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় নারীরা এখন অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি স্বাধীন। ফলে তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।

মানসিকতার পরিবর্তন ও সামাজিক প্রভাব
চীনে এক সন্তান নীতির কারণে পরিবারগুলো কন্যাদের শিক্ষায় বেশি বিনিয়োগ করেছে। এর ফলেই আজ নারীরা শিক্ষিত ও সচেতন হয়ে উঠেছেন। যদিও ‘নারীবাদ’ শব্দটি অনেকেই ব্যবহার করতে চান না, তবুও সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমান অধিকার দাবি করছেন। একই সঙ্গে অনেক নারী বিয়ের প্রতিষ্ঠানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।
বিবাহের প্রতি আগ্রহ কমছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়ের সংখ্যা কমে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও কিছু বছরে সাময়িকভাবে বিয়ে বেড়েছে, তবুও সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী। বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন না লিঙ্গসমতা নিশ্চিত হয়, ততদিন এই প্রবণতা বদলানো কঠিন।
সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমে প্রতিফলন
এই পরিবর্তন শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়; চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা বাড়ছে, এবং সমাজে তা ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















