একসময় “প্রেপার” শব্দটি শুনলেই মনে হতো আতঙ্কিত কিছু মানুষের কথা, যারা সমাজ ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় খাবার মজুত করে রাখে। কিন্তু সময় বদলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এখন বিপর্যয়ের প্রস্তুতি নেওয়া অনেকের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠছে। আর এই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়েই দ্রুত বাড়ছে বাঙ্কার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবসা।
প্রস্তুতির সংস্কৃতি এখন মূলধারায়
গত কয়েক বছরে বিপর্যয়ের আশঙ্কা মানুষের ভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ নিজেদের “প্রেপার” হিসেবে ভাবেন, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণ। সামাজিক মাধ্যমে বেঁচে থাকার কৌশল নিয়ে ভিডিও লাখ লাখ মানুষ দেখছে। জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ খরচ করছেন সাধারণ মানুষ।
বাঙ্কার ব্যবসার বিস্তার
এই প্রবণতার সবচেয়ে চরম রূপ দেখা যাচ্ছে বাঙ্কার শিল্পে। ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও বিক্রি এখন একটি দ্রুতবর্ধনশীল বাজারে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই খাতের আকার কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। নির্মাতারা বলছেন, এখন অনেক জায়গায় বাঙ্কার তৈরি করা যেন বাড়িতে সুইমিং পুল বানানোর মতোই সাধারণ হয়ে উঠছে।

বাজারে বিভিন্ন স্তরের গ্রাহক
এই শিল্পে বিভিন্ন দামের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক লাখ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক কোটি টাকার বাঙ্কার পর্যন্ত রয়েছে। কেউ কেউ ছোট আকারের নিরাপদ আশ্রয় চান, আবার ধনী গ্রাহকেরা বিলাসবহুল সুবিধাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ ঘর তৈরি করছেন। এমনকি নিজে বানাতে চান এমন গ্রাহকদের জন্য আলাদা করে প্রয়োজনীয় উপকরণও বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতি ও যুদ্ধের প্রভাব
আন্তর্জাতিক উত্তেজনা এই ব্যবসাকে আরও চাঙ্গা করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত এবং যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্কারের চাহিদাও বেড়েছে। নির্মাতারা বলছেন, নতুন নতুন দেশে তারা গ্রাহক পাচ্ছেন এবং অর্ডারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
‘সারভাইভাল কমিউনিটি’ তৈরির প্রবণতা

শুধু একক বাঙ্কার নয়, এখন গড়ে উঠছে পুরো “বেঁচে থাকার কমিউনিটি”। পুরনো সামরিক ঘাঁটি বা গোলাবারুদ সংরক্ষণাগারকে রূপান্তর করে তৈরি করা হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে জায়গা কিনে বা ভাড়া নিয়ে থাকতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে ৯৯ বছরের লিজের মতো দীর্ঘ সময়ের জন্য চুক্তি করা হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক
তবে এই ব্যবসা একেবারে মসৃণ নয়। নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আইনি জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিছু গ্রাহক প্রতিশ্রুত সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। আবার জমি বা লিজ সংক্রান্ত বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সমাজ ভেঙে পড়ার ভয়, না নতুন বাজার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা একদিকে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি একটি বড় ব্যবসার সুযোগও তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মাঝে মানুষ এখন শুধু নিজের নয়, একটি ছোট কমিউনিটির সঙ্গেও নিরাপদ থাকতে চাইছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















