দুই শতাব্দীর বেশি আগে আমেরিকার অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর, যেখানে প্রাকৃতিক প্রভাব থাকলেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ওঠানামা ছিল না। কিন্তু উনিশ শতকে পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটার পরই শুরু হয় গভীর অর্থনৈতিক চক্র, যার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ ১৯৩০-এর মহামন্দা ও ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দা। এই অস্থিরতার মধ্যেই অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস এমন এক ধারণা তুলে ধরেন, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই নতুনভাবে বাঁচার পথ দেখায়।
কেন প্রয়োজন হয়েছিল নতুন ভাবনার
মহামন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। সেই সময় অনেক অর্থনীতিবিদ বিশ্বাস করতেন, বাজার নিজেই একসময় ভারসাম্যে ফিরে আসবে। কিন্তু কেইনস যুক্তি দেন, এই অপেক্ষা মানুষের জন্য ভয়াবহ কষ্ট ডেকে আনবে। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য—দীর্ঘমেয়াদে আমরা সবাই মৃত—এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
সরকারি হস্তক্ষেপের নতুন দর্শন
:max_bytes(150000):strip_icc()/financial-graph-on-technology-abstract-background-1086740218-5c7ea9f9c9e77c00011c843f.jpg)
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থে কেইনস দেখান, বাজার সবসময় নিজে নিজে স্থিতিশীল হতে পারে না। বিশেষ করে বড় ধরনের মন্দায় শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, সরকার যদি সরাসরি ব্যয় বাড়িয়ে চাহিদা তৈরি করে, তাহলে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এই ধারণাই অর্থনীতিতে এক বড় বিপ্লব তৈরি করে।
রুজভেল্টের পদক্ষেপ ও বাস্তব প্রয়োগ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট কেইনসের তত্ত্ব পুরোপুরি প্রণীত হওয়ার আগেই নানা পদক্ষেপ নেন। তাঁর উদ্যোগে সরকারি ব্যয় বাড়ানো হয়, যা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে এই নীতিই বিভিন্ন সময়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর প্রমাণিত হয়।
বিরোধিতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
কেইনসের ধারণা অনেকের কাছে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেয়। রক্ষণশীল মহলের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে কর বৃদ্ধি ও সামাজিক সুবিধা সম্প্রসারণ ঘটতে পারে। তবুও সময়ের সঙ্গে দেখা গেছে, এই নীতিই অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে।

পরবর্তী দশকগুলোর অভিজ্ঞতা
সত্তরের দশকে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পর কেইনসীয় নীতির সমালোচনা বাড়ে এবং সরবরাহভিত্তিক নীতির দিকে ঝোঁক দেখা যায়। কর কমানো ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে—এমন ধারণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং বাজেট ঘাটতি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি সীমিতই থেকেছে।
আধুনিক সময়ে প্রাসঙ্গিকতা
২০০৮ সালের মন্দা এবং সাম্প্রতিক মহামারির সময় আবারও প্রমাণ হয়েছে, সরকারি ব্যয় অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবুও এই নীতিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।
উপসংহার
কেইনস কোনো বিপ্লব চাননি, তিনি চেয়েছিলেন পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখতে ছোট একটি সংশোধন। কিন্তু সেই সংশোধনই সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠেছে অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। তাঁর ধারণা না থাকলে পুঁজিবাদ হয়তো এতদিন টিকেই থাকত না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















