চার বছর আগে বিশ্ব এক বড় মানবিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছিল—অন্তত এমনটাই মনে হয়েছিল। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিলেও পরে কৃষিপণ্য পরিবহনের সমঝোতায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু সেই স্বস্তি ছিল সাময়িক। দরিদ্র মানুষের জীবনে খাদ্য সংকট কখনোই পুরোপুরি দূর হয়নি।
এখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আবারও একই ধরনের ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়া খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই কম ফসল ফলাচ্ছে, অনেকেই খাবার কমিয়ে দিচ্ছে। সতর্ক করা হয়েছে, যদি বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক না হয়, তবে ইতিমধ্যে খাদ্য সংকটে থাকা ৩০ কোটির বেশি মানুষের সঙ্গে আরও প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ যুক্ত হতে পারে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা
ইরান ও তার প্রতিবেশীরা বড় খাদ্য রপ্তানিকারক না হলেও বৈশ্বিক কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল থেকে বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ৩০ শতাংশ সার, ২০ শতাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ১৫ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই জ্বালানি ও উপকরণ কৃষি উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ টন সার হরমুজ প্রণালীর কারণে আটকে আছে। এই সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সময়মতো জমিতে সার পৌঁছাবে না, ফলে উৎপাদন কমে যাবে। এতে খাদ্যের দাম বাড়বে এবং শহরের দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এল নিনো ও জলবায়ুর দ্বৈত আঘাত
এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে এল নিনো। এটি এমন একটি আবহাওয়া পরিস্থিতি, যা প্রতি কয়েক বছর পরপর পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও অতিবৃষ্টির মতো চরম পরিস্থিতি তৈরি করে।
আগের অভিজ্ঞতা বলছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু দেশে খাদ্য উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোতে শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ খরা দেখা যায়, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এ বছর এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলে পরিস্থিতিকে আরও চরম করে তুলবে—যেখানে শুষ্ক অঞ্চল আরও শুষ্ক এবং ভেজা অঞ্চল আরও ভেজা হয়ে উঠবে।
সমাধান সম্ভব, কিন্তু উদ্যোগের অভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব। প্রয়োজনীয় সার ইতিমধ্যেই অনেকাংশে উৎপাদিত হয়েছে এবং এখনো সময় আছে তা কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। পাশাপাশি গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ভুট্টার একটি বড় অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ধনী দেশগুলো চাইলে দরিদ্র দেশগুলোকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার পরিবহন নিশ্চিত করা বা বাণিজ্যিক বাধা তুলে নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

ক্ষুধার সামনে নীরব বিশ্ব
এই সংকটের সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো—এটি প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। উচ্চ জ্বালানি দামের কারণে কৃষকরা খাদ্যের বদলে জ্বালানি উৎপাদনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। অন্যদিকে ধনী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
ফলে একটি ধীরগতির কিন্তু মারাত্মক খাদ্য বিপর্যয় সামনে এগিয়ে আসছে—যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক দিক থেকেও গভীর সংকট তৈরি করবে।
বিশ্ব যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই সংকট একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এবং তার মূল্য দিতে হবে সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















