ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যে প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেক দ্রুত এবং গভীরভাবে দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন এবং বাণিজ্যিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় অর্থনীতি ও সমাজ—দুই ক্ষেত্রেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে কোভিড মহামারির সময়কার ধাক্কার সঙ্গে তুলনীয়।
দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংকটের ছবি
যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে এশিয়ার বহু দেশে হঠাৎ করেই দেখা দিয়েছে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পণ্যের ঘাটতি, পরিবহন সংকট এবং মূল্যস্ফীতি।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক দেশে বিমান চলাচল কমে গেছে, খাদ্যের দাম বেড়েছে, কারখানায় উৎপাদন থমকে গেছে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কমে এসেছে।
জ্বালানি নির্ভরতা ও সরবরাহ সংকট

হরমুজ নিয়ন্ত্রণে রাখার মুরাল তৈরি করা হচ্ছে
এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। যুদ্ধের ফলে এই সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি বাজার থেকে বাইরে চলে গেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। এমনকি হরমুজ প্রণালী আবার চালু হলেও আগের মতো সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
পরিবহন খাতে বড় ধাক্কা
যুদ্ধ শুরুর পরপরই এশিয়ার পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। বিমান, জাহাজ ও ট্রাক চলাচল কমে যায়।
বিশ্বজুড়ে মার্চ মাসে ৯২ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় দ্বিগুণ। জ্বালানির দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় অনেক এয়ারলাইন তাদের রুট কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ করেছে।
এর ফলে পর্যটন খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। অনেক হোটেলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং কমে গেছে। দূরবর্তী এলাকাগুলো আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

ভিয়েতনামের কৃষকরা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সারের সমস্যায় ভুগছে
উৎপাদন খাতে সংকট
এশিয়ার শিল্পখাত ব্যাপকভাবে জ্বালানি ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে এসব উপকরণের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় নিকেল উৎপাদন কমে গেছে, কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও সালফারের সরবরাহ কমেছে। পোশাকশিল্পেও একই অবস্থা—বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
একইভাবে, চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হিলিয়াম গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা প্রযুক্তি খাতেও চাপ বাড়াচ্ছে।
সরবরাহ চেইনের ভাঙন
একটি সমস্যার সঙ্গে আরেকটি সমস্যা যুক্ত হয়ে বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্লাস্টিকের অভাবে প্যাকেজিং কমে যাচ্ছে, সার সংকটে কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে, এমনকি মাংস সরবরাহেও ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব

মালেশিয়ায় এইমাসে ৩৫% বিমান চলাচল কমিয়ে দিয়েছে জ্বালানির অভাবে
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এশিয়ায় প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ভারতে জ্বালানি সংকটে শিল্প এলাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। ফিলিপাইনে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট করছে। ছোট ব্যবসায়ীদের আয় কমে গেছে, খরচ বেড়েছে।
খাদ্য ও জীবিকার সংকট
জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে না নিয়ে ক্ষেতে ফেলে রাখছেন। এতে একদিকে খাদ্য অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে দাম বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা

শ্রীলংকার সি-বীচে পর্যটক কমে গেছে এশিয়ার অধিকাংশ হোটেলে বুকিং নেই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক ধাক্কা দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। সংকটের ঢেউ ইতিমধ্যে এশিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পথে।
জ্বালানি ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ সংকট একসঙ্গে মিলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না।
শেষ পর্যন্ত এই সংকট শুধু অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ায় মিটেল উৎপাদন থেমে গেছে গ্যাসের অভাবে

বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির উৎপাদন ও শীপমেন্ট ব্যহ্নত হচ্ছে জ্বালানির অভাবে

তাইওয়ানের চিপ মেকাররা অলস সময় কাটাচ্ছে

ম্যানিলার একটি গ্যাস স্টেশনের চিত্র

ফিলিপাইনে জ্বালানির অভাবে পানি দিতে না পারায় বাধা কপি ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















