তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। প্রচারের ভাষা তীব্র হচ্ছে, ইশতেহার খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এর মাঝেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যুবসমাজ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা কি শুধু স্লোগান আর প্রতীকের বাইরে রাজনীতি বোঝে? ভোটদানে আগ্রহ থাকলেও গভীর বোঝাপড়া অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
পৃষ্ঠস্থ অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা
অনেক তরুণ ভোট দেয়, সামাজিক মাধ্যমে মতামত প্রকাশ করে, কিংবা ক্যাম্পাসে আলোচনা করে। কিন্তু এই অংশগ্রহণ প্রায়ই পৃষ্ঠস্থ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে, কারণ এর পেছনে সুসংগঠিত রাজনৈতিক জ্ঞান থাকে না। ফলে তাদের সক্রিয়তা থাকলেও তা সবসময় সচেতন বা বিশ্লেষণভিত্তিক হয় না।
সামাজিক মাধ্যম রাজনৈতিক বিষয়কে সহজলভ্য করলেও, তা প্রায়ই আলোচনাকে ছোট পোস্ট, মিম এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ করে দেয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় জটিল বিষয় নিয়ে গভীর মতামত প্রকাশে দ্বিধা বোধ করে—কখনও জ্ঞানের অভাবে, কখনও সমালোচনার ভয়ে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের অভাবে, চিন্তাশীল সংলাপের বদলে নিষ্ক্রিয় গ্রহণ বাড়ে। জটিল রাজনৈতিক বিষয়গুলো তখন সহজীকৃত বা তুচ্ছ রূপে উপস্থাপিত হয়।

শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ঘাটতি
এই রাজনৈতিক জ্ঞানের ঘাটতি হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার ফল। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও চাকরির উপযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু নাগরিক ও রাজনৈতিক শিক্ষাকে উপেক্ষা করে। ফলে শিক্ষার্থীরা পেশাগত দক্ষতা অর্জন করলেও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি পায় না।
গণতন্ত্র কেবল ভোটদানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সচেতনতা ও সমালোচনামূলক অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক গড়ে তোলা।
পাঠ্যক্রমে রাজনীতি অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন
এই প্রেক্ষাপটে, সব বিষয়ে অন্তত ঐচ্ছিক হিসেবে রাজনীতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। নিরপেক্ষভাবে তৈরি এমন একটি কোর্স শিক্ষার্থীদের সরকার কাঠামো, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন ব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
এছাড়া নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা ও দায়িত্ব, রাজনৈতিক দলের কাজ এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করতে পারবে এবং সচেতনভাবে ভোট দিতে সক্ষম হবে।
সচেতন নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীর ভূমিকা
শিক্ষার্থীদের নিজেদের শুধুমাত্র ভোটার হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে ভাবতে শেখা জরুরি। তাদের মতামত, সিদ্ধান্ত এবং অংশগ্রহণ সরাসরি শাসনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে—এই উপলব্ধি তৈরি হলে অংশগ্রহণ একটি দায়িত্বে পরিণত হয়।
এর ফলে আলোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নাগরিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণ বাড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব
রাজনৈতিক শিক্ষা চালু হলে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করতে শিখবে এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে। এতে শাসনব্যবস্থা ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমবে, বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদে এমন শিক্ষা একটি প্রজন্ম তৈরি করবে, যারা ভ্রান্ত তথ্যের প্রতি কম সংবেদনশীল হবে এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনায় আগ্রহী হবে। ফলে নাগরিকরা আরও বেশি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা দাবি করতে পারবে, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।
রাজনৈতিক শিক্ষা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা
অনেকে মনে করেন, শিক্ষায় রাজনীতি অন্তর্ভুক্ত করলে তা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক শিক্ষা মানে কোনো মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তা করতে শেখায়।
নির্বাচনের সময়ে শাসন ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে আলোচনা বাড়লেও, তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বর্তমানের ভোটার নয়, ভবিষ্যতের নেতা ও নীতিনির্ধারক।
সচেতনতা ছাড়া গণতন্ত্র অপূর্ণ
গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে শুধু ভোটদান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক শিক্ষা ও সচেতনতা। যখন নাগরিকরা জ্ঞান ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে, তখনই গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠে।
ডি. প্রভীন স্যাম 



















