লেবাননে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ চলাকালীন সময়েও বিশ্বজুড়ে অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, যখন খবর আসে যে পাকিস্তান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করেছে। এর লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা।
তবে এই স্বস্তি ছিল সাময়িক। লেবাননেও সাময়িক শান্তি এলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ সংযমের ফল নয়। পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিলেন একটি সমঝোতা করাতে, যাতে ট্রাম্প ইরান ধ্বংসের হুমকি থেকে সরে আসতে পারেন। অর্থাৎ এই যুদ্ধবিরতি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির প্রভাব নয়, বরং তাদেরই তৈরি সংকট নিয়ন্ত্রণের ফল।
যুদ্ধবিরতি এখনও অনিশ্চিত। ইরান এখনো হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, আর আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছেন। এই পরিস্থিতি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—আমেরিকার একক আধিপত্যের যুগ শেষের পথে, এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেখিয়েছে যে শক্তি ও হুমকির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বৈশ্বিক ব্যবস্থা টেকসই নয়। ট্রাম্প আমলে এর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে, তবে এই সংকট অনেকদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ড্রোন যুদ্ধ—এসবই পূর্ববর্তী প্রশাসনের ধারাবাহিকতা। একইভাবে চীনের প্রতি বৈরিতা, কিউবার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—সবই দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির অংশ।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতি আরও তীব্র হয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি, বিদেশি সহায়তা কমানো, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ এবং ইরানের বিরুদ্ধে বিতর্কিত যুদ্ধ—এসবই সেই প্রবণতার প্রমাণ।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব সমান নয়। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের মতোই এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় ধরনের ঋণ সংকটে ফেলতে পারে।
তবে এই সংকট ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল বন্ধ হওয়ার ঘটনাকেও মনে করিয়ে দেয়, যা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের পথ খুলে দিয়েছিল। ইরানের পদক্ষেপও একই ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রেশনিং, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ঋণের খরচ বেড়ে গেছে। সীমিত জ্বালানি ও সার সরবরাহের প্রতিযোগিতায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ধনী দেশগুলোর কাছে পিছিয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি আবার দেখিয়ে দিয়েছে কারা প্রকৃত প্রভাবশালী। জি-৭ দেশগুলো নয়। তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার আভাস থাকলেও তারা ইরানে স্কুলে বোমা হামলার দায় স্বীকার করেনি, যেখানে শতাধিক শিশু নিহত হয়। তারা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার কথা বললেও কার্যকর কোনো সমাধান দেয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে যুক্তরাজ্য ৪০টির বেশি দেশকে নিয়ে ইরানকে প্রণালী খুলে দিতে আহ্বান জানায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেখানে উপস্থিত ছিল না, আর গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, মিসর ও চীনও অনুপস্থিত ছিল। প্রস্তাবিত সমাধান ছিল নতুন নিষেধাজ্ঞা, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।
এ অবস্থায় দরকার ছিল কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তির মতো বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ, যেখানে যুদ্ধ চললেও ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানি সম্ভব হয়েছিল। সেই উদ্যোগ দেখিয়েছিল যে শত্রুপক্ষের মধ্যেও সহযোগিতা সম্ভব, যদি অর্থনৈতিক ক্ষতি বেশি হয়ে যায়।
হরমুজ প্রণালীতে একই মডেল প্রয়োগ করতে হলে এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা পশ্চিমা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে মুক্ত। বাস্তবে ইরান কখনোই পুরোপুরি এই পথ বন্ধ করেনি, বিশেষ করে যেসব দেশ শত্রু নয় তাদের জন্য।
এই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতায় উৎসাহ দিয়েছিল। পাকিস্তানও সেই ভূমিকায় উপযুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা ইরানে হামলার নিন্দা জানায় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। চীনকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয় এবং উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখা হয়।

তবুও যুদ্ধের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালীতে শত শত জাহাজ আটকে আছে, আর তেলের দাম ও বাজার ওঠানামা করছে ট্রাম্পের প্রতিটি বক্তব্যে।
বিশ্বের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে নীরব। অনেক দেশ সরাসরি সমালোচনা করতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসছে না এবং সংকটের মূল কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার বদলে ইরানের প্রতিক্রিয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে নিজেদের তৈরি সংকট সামাল দিতে। আগে যেখানে ইউরোপে যুদ্ধবিরতি হতো, এখন ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে।
এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন এক ভবিষ্যতের দিকে—যেখানে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেদের শর্তে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
পেদ্রো আব্রামোভাই 



















