বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের ঋণ এখন শুধু অর্থছাড়ের প্রশ্ন নয়, বরং আস্থা, সংস্কার এবং নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন, ভর্তুকি কমানো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং ব্যয়-শৃঙ্খলা—এই কয়েকটি জায়গায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়াই ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া কঠিন করে তুলছে। আইএমএফের নিজস্ব মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, কর্মসূচির অগ্রগতি “অসম” ছিল; রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বড় ব্যবধানে মিস হয়েছে, ব্যাংক পুনর্গঠনের উচ্চপর্যায়ের কৌশল এখনো বকেয়া, আর বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপও কর্মসূচির বোঝাপড়ার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফের সহায়তা কর্মসূচিতে ঢোকে। পরে ২০২৫ সালের জুনে তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যালোচনা একসঙ্গে শেষ করে নির্বাহী বোর্ড মোট সহায়তার অঙ্ক আরও বাড়ায় এবং কর্মসূচির মেয়াদও ছয় মাস বাড়ায়। সেই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়, আইএমএফ বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখতে চায়, কিন্তু তা শর্তসাপেক্ষ—বিশেষ করে রাজস্ব, ব্যাংকিং এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতার সংস্কার দৃশ্যমান হতে হবে।
সবচেয়ে বড় বাধা এখন রাজস্ব খাতে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বহু বছর ধরেই খুব নিচু। বিশ্বব্যাংক বলছে, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এ অঞ্চলের অনেক সমমানের দেশের তুলনায়ও কম, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি বাড়ার বদলে দুর্বলই থেকেছে। আইএমএফের মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, সরকারি রাজস্ব সংগ্রহ নির্ধারিত কর্মসূচিগত মানদণ্ড থেকে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে গেছে। এর অর্থ হচ্ছে, সরকার ব্যয় বাড়াতে চাইলে তার পেছনে স্থায়ী আয়ভিত্তি নেই; ফলে ঋণদাতা সংস্থার চোখে আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
রাজস্ব সংস্কারের প্রশ্নটি শুধু টাকা তুলতে না পারার বিষয় নয়, এটি প্রশাসনিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত। করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা, করছাড়ের জাল ছোট করা, ভ্যাট ব্যবস্থাকে সরল করা এবং কর-অনুগত্য বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ বহুদিন আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়ন ধীর। বিশ্বব্যাংক আগেই সতর্ক করেছে, রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতি—সবকিছুর ওপর চাপ বাড়ায়। ফলে আইএমএফের দৃষ্টিতে রাজস্ব সংস্কার এখন কেবল একটি শর্ত নয়, পুরো কর্মসূচির কেন্দ্রীয় পরীক্ষা।

দ্বিতীয় বড় বাধা ব্যাংক খাত। আইএমএফের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বেড়েছে এবং ব্যাপক মূলধন-ঘাটতির সমস্যা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক পুনর্গঠনের যে উচ্চপর্যায়ের কৌশল কর্মসূচির অধীনে নেওয়ার কথা ছিল, তা এখনো ঝুলে আছে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, আর্থিক খাতের দুর্বলতা প্রবৃদ্ধিকে চেপে ধরছে, আর ব্যাংকিং সমস্যার সমাধানে দেরি হলে মধ্যমেয়াদে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই ব্যাংক খাতের সংকট এখন শুধু খেলাপি ঋণ বা সুশাসনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি বাজেট, প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ ঋণ-সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, কার্যকর সংস্কারের জন্য ব্যাংক ও বেসরকারি খাতে নতুন মূলধন জোগানো জরুরি। অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব স্বীকারোক্তিতেও বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতকে সুস্থ না করে কেবল আইএমএফের কিস্তি তুলেই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি ফেরানো যাবে না।
তৃতীয় বড় জটিলতা জ্বালানি ভর্তুকি ও মূল্যনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে বাংলাদেশে ভর্তুকির চাপও বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলছে, বাড়তি জ্বালানি ভর্তুকি, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আর্থিক ঘাটতি আরও চাপে পড়ছে। একই সময়ে আইএমএফ বৈশ্বিক পর্যায়েই সতর্ক করেছে যে, ব্যাপক জ্বালানি ভর্তুকি রাজস্বচাপ বাড়ায় এবং অর্থনীতিতে ভুল সংকেত পাঠায়; তাদের পরামর্শ হলো, সার্বজনীন ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আইএমএফের নীতিগত অবস্থানের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
চতুর্থ বাধা বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা। আইএমএফ আগের আলোচনাগুলোতে টাকার বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করার ওপর জোর দিয়েছিল। ২০২৫ সালের আলোচনায় অগ্রগতির একটি জায়গা ছিল এ বিনিময় হার সংস্কার নিয়ে সমঝোতা, কিন্তু ২০২৬ সালের মূল্যায়নে আবারও বলা হয়েছে যে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ কর্মসূচির বোঝাপড়ার সঙ্গে সবসময় খাপ খায়নি। এর অর্থ, বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকে যাত্রা এখনো পুরোপুরি মসৃণ হয়নি। আইএমএফের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, রেমিট্যান্সের প্রণোদনা এবং বহির্বাণিজ্যের স্থিতি—সবকিছুর সঙ্গে এই প্রশ্নটি জড়িত।

পঞ্চম বাধা হলো দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত আর্থিক পরিসর। বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি চাপে রয়েছে। একই সঙ্গে তারা বলছে, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ও বর্তমান ব্যয়ের চাপ রাজস্ব উন্নতি সত্ত্বেও আর্থিক ঘাটতি বাড়াতে পারে। আইএমএফও জানুয়ারির মূল্যায়নে উল্লেখ করে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতিকে নিচের দিকে টানছে। ফলে সরকার যদি একই সময়ে বড় বাজেট, ভর্তুকি, সামাজিক ব্যয় এবং ব্যাংক উদ্ধার—সব একসঙ্গে করতে চায়, তাহলে ঋণদাতাদের চোখে প্রশ্ন আরও বাড়বে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে। সরকার একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সামাজিক ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে চায়; অন্যদিকে আইএমএফ চাইছে ভর্তুকি আরও লক্ষ্যভিত্তিক হোক, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ুক, ব্যাংক খাতে কঠোর পুনর্গঠন হোক এবং নীতি বাস্তবায়নে দেরি কমুক। এই দ্বন্দ্বের কারণেই ঋণ পাওয়া পুরোপুরি বন্ধ না হলেও প্রতিটি কিস্তি এখন হয়ে উঠছে কঠিন দরকষাকষির বিষয়।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে আইএমএফ ঋণ পাওয়ার প্রধান বাধা পাঁচটি—রাজস্ব আদায়ের বড় ঘাটতি, ব্যাংক পুনর্গঠনে ধীরগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি কমাতে অনীহা, বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অসম্পূর্ণ সংস্কার, এবং সীমিত রাজস্বভিত্তি নিয়েও ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা। আইএমএফের কাছে এগুলো কেবল হিসাবের বিষয় নয়; এগুলো রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সংস্কার-সক্ষমতার সূচক। তাই পরের কিস্তি পেতে বাংলাদেশকে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান বাস্তবায়নও দেখাতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















