লন্ডনের এক রেস্তোরাঁয় নিয়মিত লাঞ্চ—শুনতে সাধারণ অভ্যাস মনে হলেও, এই অভ্যাসই হয়ে উঠেছে এক মানুষের জীবনের স্মৃতি, সংকট আর সম্পর্কের নীরব সাক্ষী। দীর্ঘ ২৫ বছরের বন্ধুত্ব, প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ এবং ক্যানসারের মতো কঠিন বাস্তব—সবকিছুর মধ্যেই স্থির থেকেছে সেই লাঞ্চের টেবিল।
নিয়মিত লাঞ্চে গড়ে ওঠা বন্ধন
প্রায় আড়াই দশক ধরে বন্ধু রিকের সঙ্গে তিন-চার মাস পরপর একই জায়গায় দেখা করেন লেখক। এই সময়ের মধ্যে শতাধিকবার সেখানে খাওয়া হয়েছে। নিয়মটা কখনো বদলায়নি—দুজন মিলে বসা, খাওয়া, কথা বলা, তারপর আবার পরের দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাদের জীবন, অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি।
প্রেম ও সম্পর্কের ওঠানামা
বন্ধু রিক সবসময় বাস্তববাদী, সংক্ষিপ্ত কথায় সম্পর্কের জটিলতা বোঝাতে পারদর্শী। লেখকের জীবনে একের পর এক ব্যর্থ সম্পর্কের সময় রিকের মন্তব্য ছিল সরাসরি এবং স্পষ্ট। এমনকি একসময় বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনাও তিনি নির্দ্বিধায় শেয়ার করেন রিকের সঙ্গে—যা পরে জীবনের এক অদ্ভুত স্মৃতিতে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত লেখক এমন একজনকে খুঁজে পান, যাকে বিয়ে করেন। তাদের বাগদান অনুষ্ঠানও হয় সেই প্রিয় রেস্তোরাঁতেই—যা তার কাছে বিয়ের চেয়েও স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময় মনে হয়েছিল।

বাবা হওয়া ও জীবনের নতুন উপলব্ধি
চল্লিশের পর বিয়ে এবং তারপর সন্তান জন্ম—এই অভিজ্ঞতা লেখকের জীবনে নতুন অর্থ নিয়ে আসে। সন্তানের মাধ্যমে তিনি ভালোবাসার গভীরতা নতুনভাবে উপলব্ধি করেন। জীবনের এই পর্যায় তাকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার সময়
বাইরে থেকে সুখী মনে হলেও, তার বিবাহিত জীবনে ধীরে ধীরে ভাঙন দেখা দেয়। বিচ্ছেদের পথে এগোতে গিয়ে বন্ধুদের সমর্থন পেলেও, রিকের সঙ্গে সেই নির্দিষ্ট সময়ের আলাপচারিতা তাকে আলাদা মানসিক স্বস্তি দেয়। কম দেখা হলেও, এই সম্পর্কের গভীরতা ছিল অন্যরকম।
ক্যানসারের মুখোমুখি
একটি রক্তপরীক্ষা থেকে হঠাৎই ধরা পড়ে দীর্ঘস্থায়ী লিউকেমিয়া। প্রথমে বিষয়টি ছিল ভয়াবহ, বিশেষ করে একজন বয়স্ক বাবা হিসেবে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা আরও বাড়ে। তবে দ্রুত শনাক্ত হওয়ায় চিকিৎসা শুরু হয় সময়মতো। বর্তমানে নিয়মিত ওষুধে তার অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চিকিৎসার নানা কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি মানসিকভাবে দৃঢ় থেকেছেন। সন্তানদের কাছেও বিষয়টি লুকাননি, বরং স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন—যাতে ভয় কমে।

বন্ধুত্বের বিশেষ আশ্রয়
এই পুরো সময়জুড়ে রিকের সঙ্গে লাঞ্চ ছিল এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। খুব ঘন ঘন দেখা না হলেও, নির্দিষ্ট সময়ের এই সাক্ষাৎ তাকে নিজের কথা খোলামেলা বলার সুযোগ দিয়েছে। জীবনের দ্রুত পরিবর্তনের মাঝেও এই সম্পর্ক তাকে স্থিরতা দিয়েছে।
বর্তমানের অপেক্ষা
শেষবার দেখা হয়েছিল বড়দিনের আগে। এখন আবার নতুন লাঞ্চের অপেক্ষা। প্রিয় খাবারের চেয়েও বেশি, তিনি অপেক্ষা করছেন বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার জন্য—যেখানে জীবনের নতুন গল্পগুলো আবার ভাগ করে নেওয়া যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















