নন্দীগ্রামের বদর আউলিয়া পীর সাহেব মাজারের মাঠে ঘোড়দৌড়ের উৎসব। চারপাশে ভিড়, উৎসাহ আর উল্লাসে মুখর মানুষ। এই মাঠে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম—দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মিজানুর শাহ দ্রুত দলের প্রার্থী পবিত্র করকে নিয়ে আসার জন্য সহকর্মীদের তাগিদ দেন, যাতে তিনি উপস্থিত জনতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
ভোটের আগে নন্দীগ্রামের গুরুত্ব
২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের আগে নন্দীগ্রাম পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মোট ১৫২টি আসনের মধ্যে এই কেন্দ্রটি বিশেষ নজরে, কারণ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের ইতিহাসে নন্দীগ্রামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন, যা নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে শুরু হয়েছিল, সেটিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যায়। তবে ২০২১ সালে এই নন্দীগ্রামেই তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তিনি অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। ফলে এবারের নির্বাচন সম্মান রক্ষার লড়াই হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রার্থী নির্বাচন ও রাজনৈতিক সমীকরণ
এইবার তৃণমূল কংগ্রেস শুভেন্দুর বিরুদ্ধে তাঁরই প্রাক্তন সহকারী পবিত্র করকে প্রার্থী করেছে। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছেন।
রাজ্যের অন্যান্য অংশে কল্যাণমূলক প্রকল্প বা সাংস্কৃতিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা চললেও, নন্দীগ্রামে মূল প্রশ্ন—কে বড় হিন্দু? পবিত্র কর না শুভেন্দু অধিকারী?
তৃণমূলের ধারণা, মুসলিম ভোট (প্রায় ২৩ শতাংশ) তাদের সঙ্গেই থাকবে। তাই তারা এখন হিন্দু ভোটের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে। দল মনে করছে, এই ভোটের দিকেই নির্ভর করবে জয়-পরাজয়।
প্রচারে ধর্মীয় পরিচয় ও পাল্টা আক্রমণ
প্রচারে পবিত্র কর তাঁর প্রাক্তন নেতাকে নিশানা করে বলেন, শুভেন্দুকে নিজের পরিচয় “সনাতনী” বলে ঘোষণা করতে হয়। তাঁর দাবি, “আমাকে বা অন্য কাউকে নিজের পরিচয় আলাদা করে বলতে হয় না। সেটা প্রমাণ করে তিনি ভুয়া।”
নিজের হিন্দু পরিচয় জোরালো করতে পবিত্র কর জানান, নন্দীগ্রামে রাম নবমীর সূচনা তিনিই করেছিলেন এবং পরে শুভেন্দু এই উদ্যোগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন।
সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
হিন্দু ভোট টানার পাশাপাশি তৃণমূলের আরেকটি বড় চিন্তা হল সংখ্যালঘু ভোটে বিভাজন না হওয়া। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফোর্স যেন এই ভোটে ভাগ বসাতে না পারে, সে দিকেও নজর রাখছে দল।
কর্মসংস্থান ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ
যদিও ধর্মীয় মেরুকরণ বড় বিষয় হয়ে উঠেছে, তবুও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। নন্দীগ্রামের অনেক যুবক কাজের খোঁজে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ ও কিড্ডারপুরে গিয়ে দর্জির কাজ করেন।
তৃণমূল তাদের প্রচারে বেকার যুবকদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকার ভাতার কথা তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, তারা স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
বিজেপির প্রচারে প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গ
নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া এলাকায় বিজেপির কার্যালয়ে শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রলয় পাল বলেন, “বাংলাদেশে কী ঘটছে সবাই দেখেছে—কীভাবে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। মানুষ পশ্চিমবঙ্গকে কখনও বাংলাদেশ হতে দেবে না।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে বিজেপি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও পরিচয়ভিত্তিক উদ্বেগ তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















