ভৌগোলিক ‘বাফার জোন’ বা সুরক্ষা বলয় খুব কম ক্ষেত্রেই সেই শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে পেরেছে, যা এর সমর্থকেরা আশা করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেনকে রাশিয়া ও ন্যাটোর মাঝখানে একটি নিরপেক্ষ বাফার হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ক্রমশ তীব্র ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেয়।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জর্জেস ক্লেমেন্সোও একই ভুল করেছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের নবগঠিত রাষ্ট্রগুলো বলশেভিক রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাফার হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রথমে হিটলারের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং পরে তার পরাজয়ের পর ওয়ারশ চুক্তির অংশ হয়ে যায়।

আজকের যুগে, যখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আধুনিক অস্ত্র দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম, তখন বাফার জোনের ধারণা শুধু ভুল নয়, কার্যত অর্থহীন।
তবুও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করছেন, উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের সুরক্ষার জন্য দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশ দখল করে রাখতে হবে। তিনি সম্প্রতি লিতানি নদীর ওপর পাঁচটি সেতু ধ্বংস করার কথাও বলেছেন, যা একটি স্থায়ী বাফার জোন তৈরি করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। কিন্তু এই দখলদারিত্ব আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বরং এতে ইসরায়েলি নাগরিক ও সৈন্যদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একমত হয়েছিল যে, কোনো দেশ জোর করে অন্য দেশের ভূমি দখল করতে পারবে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৪২-এও যুদ্ধের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখলকে অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। অথচ গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল যে বিশাল এলাকা দখল করে রেখেছে, তা সারা বিশ্বের সামনে স্পষ্ট।
গাজায়, যা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সেখানে ইসরায়েলি বাহিনী অর্ধেকেরও বেশি ভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে। লেবাননে প্রায় ৮৫০ থেকে ১,০৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা—যা দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ১০ শতাংশ—দখলে রাখার পরিকল্পনা চলছে। পশ্চিম তীরেও জর্ডান ভ্যালিকে একটি স্থায়ী বাফার হিসেবে রাখার দাবি বহুদিন ধরে তুলে আসছে ইসরায়েল।
কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যখন তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে পৌঁছাতে পারে, আর ইউক্রেনের ড্রোন রাশিয়ার ভেতরে আঘাত হানতে পারে—তখন এই ধরনের বাফার জোনের যৌক্তিকতা ভেঙে পড়েছে। বরং নতুন এলাকা দখলের ফলে স্থানীয় বেসামরিক মানুষ সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।

সমালোচকেরা সতর্ক করছেন, এমন পরিস্থিতিতে বেসামরিক মানুষ কার্যত মানবঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান নেওয়ায় ইসরায়েলি সেনারাও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের আরও কাছে চলে আসছে, যা তাদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ডমিনিক টিয়ার্নি দেখিয়েছেন, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। আধুনিক যুদ্ধ শুধু কৌশলগত নয়, এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শগত লড়াইও। সামরিকভাবে শক্তিশালী বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে জয় পেলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, কারণ তারা মূল সমস্যাগুলো—যেমন বৈধতার অভাব, বিদ্রোহ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা—সমাধান করতে পারে না।
এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ইসরায়েল ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, লেবানন থেকে যারা পালিয়ে গেছে, তাদের ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। এমন নীতি নতুন নয়। ১৯৪৮ সাল থেকে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
কিন্তু বিরোধীদের উপস্থিতি থাকা এলাকায় আরও জমি দখল করার পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজাই অধিক বুদ্ধিমানের কাজ। গাজা ও লেবাননের সমস্যার সমাধানের পথ রয়েছে, কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব—বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকার—স্থিতাবস্থা বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

প্রাচীন চীনা কৌশলবিদ সান তজু বহু আগেই বলেছিলেন, শত্রুকে আঘাত করা বা ভূমি দখল করাই বিজয় নয়। কারণ শত্রু পিছু হটে আবার শক্তি সঞ্চয় করে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে পারে। ফলে সংঘাত কখনোই শেষ হয় না।
এই বাস্তবতা বুঝতে প্রাচীন জ্ঞানও দরকার নেই। স্থায়ী শান্তির জন্য মূল সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি। গাজা ও লেবাননে নিরাপত্তা কেবল বাফার জোন তৈরি করে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান, মানবিক সংকটের সমাধান এবং সংঘাতের মূল কারণগুলোর মোকাবিলা।
এর জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান, বেসামরিক মানুষের ওপর প্রভাব ফেলা কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এবং প্রকৃত আলোচনার ইচ্ছা অপরিহার্য। অন্যথায় সহিংসতার চক্র কখনোই শেষ হবে না।
দাউদ কুত্তাব 


















