মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাসের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও জানিয়েছেন, উভয় পক্ষ সামরিক অভিযান বন্ধ করে আনুষ্ঠানিক সমঝোতার পথে এগোতে রাজি হয়েছে।
আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। আলোচনায় পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি আঞ্চলিক পক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য পরবর্তী আলোচনা শুরু করার কথা রয়েছে।
সমঝোতার খসড়ায় কী আছে
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, ১৪ দফার একটি খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এতে সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহার, অবরুদ্ধ ইরানি তহবিলের একটি অংশ ছেড়ে দেওয়া এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনার কাঠামো নির্ধারণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, চূড়ান্ত আলোচনা শুরুর আগে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অবরুদ্ধ অর্থের অংশবিশেষ মুক্ত করা, তেল রপ্তানিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং সামুদ্রিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন বিতর্ক
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ট্রাম্প প্রণালিকে ‘টোলমুক্ত’ভাবে খুলে দেওয়ার কথা বললেও ইরান জানিয়েছে, জাহাজ চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, বীমা ও নৌ-সেবার জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হবে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কোনো ট্রানজিট টোল নয়; বরং নৌপথ পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সেবার ব্যয়। তবে এই অবস্থানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি বড় বাধা
চলমান সমঝোতার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও আন্তর্জাতিক তদারকির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
অন্যদিকে ইরান জোর দিয়ে বলছে, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের অধিকার ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান করেই যে কোনো সমঝোতা হতে হবে।
বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, চীন, মিসর ও পাকিস্তানসহ বহু দেশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা মনে করছে, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিও স্বস্তি পাবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রত্যাশায় তেলের দাম কমেছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে।
তবে সব পক্ষ একমত নয়। ইসরায়েলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা চুক্তি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন এবং লেবানন-সংক্রান্ত কিছু ধারার বিরোধিতা করেছেন। ফলে ১৯ জুনের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর এবং পরবর্তী আলোচনা এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন-ইরান শান্তি সমঝোতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আশাবাদ তৈরি হলেও নিষেধাজ্ঞা, অবরুদ্ধ অর্থ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর সমাধানই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















