যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আর কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নয়। সংঘাতের মূল প্রশ্ন এখন স্থানান্তরিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর নিয়ন্ত্রণে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি ভূরাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যুদ্ধের উদ্দেশ্য যখন সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের পরিবর্তে কৌশলগত পথ ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন সংঘাতের চরিত্রও বদলে যায়। এর অর্থ, সামরিক অভিযানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন এমন একটি নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে সামরিক চাপ বাড়ানো হলেও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা স্পষ্ট। লক্ষ্য হচ্ছে তেহরানকে এমন অবস্থানে নিয়ে আসা, যাতে শেষ পর্যন্ত তারা আলোচনার টেবিলে আরও নমনীয় হতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই কৌশল দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে ক্রমেই কঠোরপন্থী শক্তির প্রভাব বাড়ছে, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মধ্যে এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে যে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বাস্তব কোনো কৌশলগত লাভ নেই।
অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি শুধু প্রতিরক্ষা কাঠামোকেই দুর্বল করেনি, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই ঘাটতি পূরণে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করছে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও সক্রিয় করছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বানও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।
তবে যুক্তরাষ্ট্রও জানে, ইরানের ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সামরিক সক্ষমতার কারণে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এখনো ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্মৃতিতে অম্লান। ফলে বিমান হামলা, সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং নৌপথ সুরক্ষার মতো সীমিত লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আপাতত মনোযোগ দিচ্ছে।
এই বাস্তবতার মধ্যে ভবিষ্যৎ কয়েকটি সম্ভাব্য পথে এগোতে পারে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা হলো সীমিত প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার একটি ভারসাম্য তৈরি হওয়া। এতে উভয় পক্ষই সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে, কিন্তু এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে নিজের প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন করবে, আর যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যভিত্তিক হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা নীরব কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াবে, যাতে আলোচনার নতুন একটি কাঠামো গড়ে ওঠে।
এ ধরনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি হবে না। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোও আলোচনার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সমঝোতা সামরিক ইস্যুর পাশাপাশি বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেবে।
কিন্তু আরেকটি সম্ভাবনা অনেক বেশি উদ্বেগজনক। সেটি হলো ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে অস্থিরতা ও ভাঙনের সৃষ্টি হওয়া। যদি গোয়েন্দা তৎপরতা, অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং রাজনৈতিক চাপ একসঙ্গে বৃদ্ধি পায়, তাহলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন ছাড়াই রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে তোলার একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি বাইরে থেকে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল মনে হলেও এর ঝুঁকি অনেক গভীর। রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে গৃহযুদ্ধ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ কিংবা সামরিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি ইরানের নেতৃত্ব মনে করে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী, তাহলে তারা এমন পদক্ষেপ নিতে পারে যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া, উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে সমন্বিত হামলা, বাব আল-মান্দেবে সমুদ্র চলাচল ব্যাহত করা কিংবা উপসাগরের জলসীমায় ইচ্ছাকৃত পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি—এসব পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর নজিরবিহীন প্রভাব ফেলতে পারে। তখন সংঘাত আর আঞ্চলিক থাকবে না; তা বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেবে।
এই কারণেই হরমুজ প্রণালি এখন কেবল একটি কৌশলগত সম্পদ নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক টিকে থাকার অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষারেখায় পরিণত হয়েছে। ফলে এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি তেহরানের অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
যদিও সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে, পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থেমে নেই। বিভিন্ন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী এমন সমাধানের পথ খুঁজছেন, যা উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে এবং সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই একটি সম্মানজনক সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় তাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো সীমিত সংঘর্ষ, পারস্পরিক ক্ষয় এবং নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বজায় রাখা। এই কৌশল যুদ্ধের ব্যয় কমায়, একই সঙ্গে কূটনীতিকে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সময় দেয়। কারণ শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তি দিয়ে সব সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
ইতিহাস দেখিয়েছে, যুদ্ধের মূল্য যেমন বিপুল, তেমনি আলোচনার সুযোগ হারানোর মূল্যও কম নয়। মধ্যপ্রাচ্য যদি আরেকটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে নিমজ্জিত হয়, তাহলে তার প্রভাব কয়েক বছর নয়, কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন যুদ্ধের পথ খোলা নয়, বরং এমন একটি কূটনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন করা, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না। এটাই বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল পথ।
অধ্যাপক হাতেম সাদেক 


















