আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দ্রুত বিস্তারের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এখনও ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী? নাকি এটি এমন এক যুগের কাঠামো আঁকড়ে ধরে আছে, যার বাস্তবতা বহু আগেই বদলে গেছে? এই বিতর্ক নতুন নয়, তবে বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
আধুনিক বিদ্যালয়ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল শিল্পবিপ্লবের চাহিদা পূরণের জন্য। সেই সময় সমাজের প্রয়োজন ছিল এমন কর্মী, যারা নিয়ম মেনে কাজ করবে, সময়ানুবর্তী হবে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষ, ঘণ্টাভিত্তিক পাঠসূচি, বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমকেন্দ্রিক শিক্ষা। কিন্তু শিল্পযুগ পেরিয়ে পৃথিবী এখন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো এখনও অনেকটাই অতীতের সেই বাস্তবতার মধ্যেই আটকে রয়েছে।
এই কাঠামোর আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো বিষয়ভিত্তিক অগ্রাধিকারের প্রচলিত ধারণা। গণিত ও বিজ্ঞানকে প্রায় সব দেশেই সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। ভাষা, মানবিক বিদ্যা এবং বিশেষ করে সংগীত, নাটক কিংবা চারুকলার মতো সৃজনশীল বিষয়গুলোকে তুলনামূলকভাবে কম মূল্য দেওয়া হয়। এর ফলে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বুদ্ধিমত্তা মানেই সংখ্যাগত বা যৌক্তিক দক্ষতা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষের প্রতিভা বহুমাত্রিক। কেউ বিশ্লেষণে দক্ষ, কেউ গল্প নির্মাণে, কেউ নকশা তৈরিতে, কেউ আবার নেতৃত্ব, সহমর্মিতা কিংবা সৃজনশীল চিন্তায় অসাধারণ। প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি এই বৈচিত্র্যকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না।
সমস্যা আরও গভীর হয়েছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতির কারণে। বহু দেশে শিক্ষার্থীরা বিষয় বুঝে শেখার চেয়ে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। ফলে শিক্ষা জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। এর ফলাফলও স্পষ্ট। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় সফল হলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা বিশ্লেষণ, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কিংবা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে। নিয়োগদাতারাও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, উচ্চ ডিগ্রিধারী অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যেও বিশ্লেষণী চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে না দেখে ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা। অথচ মানুষ সবচেয়ে বেশি শেখে চেষ্টা, ভুল, সংশোধন এবং পুনরায় চেষ্টার মধ্য দিয়ে। একটি শিশু হাঁটা শিখতে গিয়ে বহুবার পড়ে যায়, কিন্তু সেই ব্যর্থতাই তাকে সফল করে তোলে। বিদ্যালয়ে এসে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি বদলে যায়। ভুল উত্তরের জন্য লাল দাগ, কম নম্বর কিংবা নেতিবাচক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যর্থতার ভয় তৈরি করে। ফলে তারা নতুন কিছু ভাবার পরিবর্তে পরীক্ষকের প্রত্যাশিত উত্তরই দিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে কৌতূহলের জায়গা দখল করে নেয় নিরাপদ পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা, আর স্বাধীন চিন্তার বদলে গড়ে ওঠে অনুকরণের সংস্কৃতি।
এর প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। নতুন কর্মীদের অনেকেই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা বোধ করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে সহমর্মিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সহযোগিতা কিংবা নৈতিক বিকাশের মতো বিষয়গুলোও অনেক শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। ফলে শিক্ষা কেবল পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, মানবিক ও সামাজিক বিকাশের ভিত্তি হিসেবে তার ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে আশার জায়গাও রয়েছে। বিশ্বের কিছু সফল শিক্ষাব্যবস্থা দেখিয়েছে, ছোটবেলা থেকেই পরীক্ষার চাপ কমিয়ে ধারণাগত বোঝাপড়া, সামাজিক দক্ষতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিলে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল হয়ে ওঠে। সেখানে শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা রয়েছে এবং মূল্যায়নের ভিত্তি মুখস্থবিদ্যা নয়, বরং একটি বিষয় কতটা গভীরভাবে বোঝা হয়েছে এবং তা বাস্তবে কতটা প্রয়োগ করা যায়। পাশাপাশি সমাজ, পরিবার এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিশ্বের চাহিদা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতের নাগরিক গড়তে শুধু তথ্য মুখস্থ করলেই চলবে না। প্রয়োজন সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, অভিযোজনক্ষমতা, সহযোগিতার মনোভাব এবং নতুন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার ফল, মুখস্থবিদ্যা এবং একরকম মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা আগামী দিনের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না।
তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৌতূহলকে নিরুৎসাহিত করা হবে না, ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে, সৃজনশীলতাকে বিলাসিতা নয় বরং অপরিহার্য দক্ষতা হিসেবে দেখা হবে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বতন্ত্র প্রতিভাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার পরীক্ষার ফলাফলে নয়, বরং তার মানুষের কল্পনাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।
জুহা শাহজাদ 


















