খ্যাতনামা লেখক হান্স রসলিং তাঁর বইতে বলেছিলেন, সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সংখ্যার পেছনের মানুষের গল্প। ইন্দোনেশিয়ার ২০২৬ সালের জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের পেছনের সংখ্যাগুলোও ঠিক তেমনই এক বাস্তবতা তুলে ধরে—এবারের ধাক্কা ২০২২ সালের মতো বিস্তৃত নয়, কিন্তু যেসব পরিবার এতে প্রভাবিত হচ্ছে, তাদের জন্য সামাল দেওয়ার জায়গা অনেকটাই সংকুচিত।
২০২২ বনাম ২০২৬: পার্থক্যের চিত্র
২০২২ সালে জ্বালানির দাম একসঙ্গে ভর্তুকিযুক্ত ও ভর্তুকিবিহীন—দুই ক্ষেত্রেই বেড়েছিল। ফলে সব শ্রেণির মানুষই এর প্রভাব অনুভব করেছিল। তখন সরকার নিম্নআয়ের পরিবারকে নগদ সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আলাদা। এবার শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট ভর্তুকিবিহীন জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্টাম্যাক্স টার্বো, ডেক্সলাইট ও পার্টামিনা ডেক্সের দাম বাড়লেও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পার্টাম্যাক্সের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আর ভর্তুকিযুক্ত পার্টালাইটের দামও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সুরক্ষিত থাকে।
ফলে নিম্নআয়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকলেও চাপটি এখন মূলত মধ্যবিত্তের ওপর এসে পড়েছে।
ব্যয়ের ভার: কার ওপর কতটা চাপ
সমীক্ষা অনুযায়ী, উচ্চবিত্তরা মাসে গড়ে মাথাপিছু প্রায় ৩৬ লিটার জ্বালানি ব্যবহার করে, যেখানে দরিদ্রদের ব্যবহার মাত্র ২ লিটার।
কিন্তু ব্যয়ের অনুপাতে চিত্র উল্টো। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের অখাদ্য ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশই জ্বালানিতে যায়, নিম্ন-মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে তা ৯ শতাংশ, আর উচ্চবিত্তের ক্ষেত্রে মাত্র ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, জ্বালানির দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খায় মধ্যবিত্ত, কারণ তাদের বাজেটে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি।

মধ্যবিত্তের সংকট আরও গভীর
২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ কমেছে। একই সময়ে এই শ্রেণির ভোগ বৃদ্ধির হারও কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৬ শতাংশে, যা আগের গড় ৬.১ শতাংশের চেয়ে কম।
অন্যদিকে, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি। ফলে ২০২৬ সালে যে শ্রেণিটি সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে, তারাই সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
সমন্বয়ের পথ সংকুচিত
২০২২ সালে মধ্যবিত্তের জন্য একটি সহজ সমাধান ছিল—দামী জ্বালানি ছেড়ে সস্তা বিকল্পে চলে যাওয়া। এতে খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে সেই সুযোগ প্রায় নেই। কারণ পার্টালাইট ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যেমন দৈনিক ৫০ লিটারের সীমা এবং কঠোর যোগ্যতার শর্ত।
ফলে যারা এখনো পার্টাম্যাক্স ব্যবহার করে, তাদের জন্য সস্তা বিকল্পে যাওয়ার সুযোগ আগের মতো নেই। তাদের এখন হয় জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হবে, নয়তো অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে।
খরচ কমানোর প্রবণতা
যখন বিকল্প সীমিত হয়ে যায়, তখন মানুষ অন্য খাতে ব্যয় কমায়। ২০২২ সালের তথ্য বলছে, জ্বালানি খরচ ১ শতাংশ কমলে টেকসই পণ্যে ব্যয় ১.৩ শতাংশ কমে যায়—যেমন ইলেকট্রনিকস, মোটরসাইকেল ইত্যাদি।
মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন দেখা যায় বিনোদন ও ব্যক্তিগত খাতে। জ্বালানি খরচ ১ শতাংশ কমলে এই খাতে ব্যয় ০.৫ থেকে ১ শতাংশ কমে।
২০২৬ সালে যেহেতু বিকল্প কম, তাই এই ব্যয় কমানোর প্রবণতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
লক্ষ্যভিত্তিক নীতি প্রয়োজন
এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন, তাই সমাধানও হতে হবে ভিন্ন। বড় আকারের ভর্তুকি নয়, বরং লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, জ্বালানির মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি পূর্বনির্ধারিত ও স্থিতিশীল পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে পরিবারগুলো আগাম সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে মধ্যবিত্তের আয় বাড়ানো, নগর জীবনের খরচ কমানো এবং অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
২০২৬ সালের পরিস্থিতি ২০২২ সালের মতো নয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। কিন্তু মধ্যবিত্তের জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি ও সহায়ক পরিবেশ, যাতে তাদের ব্যয় সংকোচন পুরো অর্থনীতিকে ধীর না করে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















