এক বছর আগেও কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টায় স্বাধীনতার দাবিতে বেশ জোরালো সুর শোনা যাচ্ছিল। নতুন সরকার গঠনের পর সেই দাবির পালে হাওয়া লেগেছিল, আর জনমত জরিপে প্রায় অর্ধেক মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উত্তাপ কমে এসেছে, আর এখন গণভোটের পথে এগোলেও সামনে দেখা দিচ্ছে একের পর এক বড় বাধা।
স্বাধীনতার দাবির পেছনের প্রেক্ষাপট
আলবার্টা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের আলাদা পরিচয় নিয়ে গর্ব করে। তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতি ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির কারণে অনেকেই মনে করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থের সঙ্গে সবসময় মেলে না। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোতে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় অনেক বাসিন্দার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই “ওয়েক্সিট” নামে পরিচিত স্বাধীনতা আন্দোলন জনপ্রিয়তা পায়।
গণভোটের প্রস্তুতি ও বাস্তব চিত্র
স্বাধীনতার পক্ষে গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে মে মাসের শুরু পর্যন্ত। আন্দোলনের নেতারা দাবি করছেন, তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তবে মাঠপর্যায়ে চিত্রটা এতটা সহজ নয়। শহরের ব্যস্ত এলাকায় স্বাক্ষর সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আগ্রহীদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কেউ সমর্থন জানালেও অনেকে আবার বিরোধিতাও করছেন, যা সমাজে বিভক্ত মতামতের ইঙ্গিত দেয়।
সমর্থন কমে যাওয়ার কারণ
২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে এই হার ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো আন্দোলনের কিছু অংশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রস্তাব। আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক জোটে নেওয়া বা নতুন অঙ্গরাজ্য বানানোর মতো ধারণা অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।

সরকারের নীতিতে পরিবর্তন
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার পূর্বের কিছু পরিবেশনীতি শিথিল করেছে, যা আলবার্টার বাসিন্দাদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল না। একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস খাতকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রদেশ ও কেন্দ্রের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা স্বাধীনতার দাবিকে কিছুটা দুর্বল করেছে।
অর্থনৈতিক শঙ্কা
প্রদেশের অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, স্বাধীনতার আলোচনা অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এই আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির চাপে এমন অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আদিবাসী অধিকার ও আইনি বাধা
আলবার্টার স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার। তাদের দাবি, স্বাধীনতা হলে অতীতে করা চুক্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের ভূমি বিভক্ত হয়ে যাবে। এই বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে মামলা হয়েছে এবং স্বাক্ষর যাচাই প্রক্রিয়াও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। আদালতের রায় যদি আদিবাসী অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে পুরো স্বাধীনতা আন্দোলনই থমকে যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, গণভোটের দিকে এগোলেও আলবার্টার স্বাধীনতার পথ মোটেও সহজ নয়। রাজনৈতিক সমর্থন কমে আসা, অর্থনৈতিক শঙ্কা এবং আইনি জটিলতা—সবকিছু মিলিয়ে আন্দোলনের সামনে এখন কঠিন সময়। একসময় যে স্বপ্ন খুব কাছে মনে হয়েছিল, এখন তা আবার দূরে সরে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















